আবৃত্তিতে যা-কিছু ঘটে, তা কখনো একা ঘটে না। একজন আবৃত্তিকার কবিতা বলেন, কিন্তু সেই কবিতার প্রকৃত জীবন শুরু হয় তখনই, যখন কেউ তা মন দিয়ে শোনে। শ্রোতা ও আবৃত্তিকার এ দুজনের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়। একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তিনি কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি তাঁর অনুভূতি, তার কণ্ঠের উষ্ণতা এবং তার মনের অবস্থা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। অন্যদিকে একজন শ্রোতা যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই কবিতা শোনেন, তখন সেই অনুভূতি তাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। আদান-প্রদানের মধ্যেই আবৃত্তির আসল সৌন্দর্য। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ভালো আবৃত্তির সময় পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে যায়। কেউ কথা বলে না, কেউ নড়াচড়া করে না। সবাই যেন একধরনের শান্ত মনোযোগে ডুবে থাকে। এই অভিজ্ঞতা অনেকটা ধ্যানের মতো। ধ্যানের সময় যেমন মানুষ নিজের ভেতরে মনোযোগ দেয়, আবৃত্তির সময়ও তেমন একটি মনোযোগ তৈরি হয়। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে সেই মনোযোগের কেন্দ্র হয় কবিতার শব্দ। একজন আবৃত্তিকার যখন সত্যিই অনুভূতি নিয়ে কবিতা বলেন, তখন শ্রোতারাও ধীরে ধীরে সেই অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। এ মুহূর্তে আবৃত্তি একটি সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। যেন সবাই একই তরঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। মঞ্চের নীরবতা আবৃত্তির মঞ্চে একটি বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। নীরবতা সাধারণ নীরবতার মতো নয়, প্রত্যাশার নীরবতা। যখন একজন আবৃত্তিকার মঞ্চে ওঠেন, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য একটি নিস্তব্ধতা তৈরি হয়। সবাই অপেক্ষা করে কবিতার প্রথম শব্দ শোনার জন্য। অপেক্ষার মুহূর্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন আবৃত্তিকার এই মুহূর্তটিকে অনুভব করতে পারেন। তিনি যদি একটু চোখ বন্ধ করেন, অথবা কয়েক সেকেন্ড শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অনুভব করতে পারবেন পুরো ঘরের মনোযোগ তাঁর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। মুহূর্তটি ধ্যানের মতো। কারণ, এখানে সবাই একই মুহূর্তে উপস্থিত। কেউ অতীতের কথা ভাবছে না, কেউ ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না। সবাই শুধু অপেক্ষা করছে পরবর্তী শব্দের জন্য। নীরবতার মধ্যেই কবিতার জন্ম হয়। যখন প্রথম শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় যেন সেই নীরবতার ভেতর থেকেই শব্দটি উঠে এসেছে এবং কবিতা শেষ হলে আবার সেই শব্দগুলো নীরবতার মধ্যেই ফিরে যায়। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই আবৃত্তির সৌন্দর্য। প্রতিধ্বনি ভালো একটি আবৃত্তি শেষ হওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায়, কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। শ্রোতারা চুপচাপ থাকে। নীরবতার মুহূর্তটি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, কবিতার শব্দগুলো তখনো বাতাসে ভাসছে। শ্রোতার মনে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি কাজ করছে। এই প্রতিধ্বনি অনেক সময় শব্দের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়। কবিতা তখন আর কেবল কণ্ঠে থাকে না; এটি শ্রোতার অন্তরে স্থান করে নেয়। ধ্যানের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায়। একটি গভীর ধ্যানের পরে মানুষ প্রায়ই কিছুক্ষণ নীরব থাকতে চায়, তখন মন খুব শান্ত থাকে। আবৃত্তির পরের নীরবতাও অনেকটা তেমন। নীরবতা আসলে কবিতার একটি অংশ। শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখানে অনুভূতি শুরু হয়। আবৃত্তি একটি অন্তরযাত্রা অনেকেই মনে করেন, আবৃত্তি মানে কেবল সুন্দরভাবে কবিতা বলা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আবৃত্তি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আবৃত্তি হতে পারে একটি অন্তরযাত্রা। যখন একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা গভীরভাবে অনুভব করেন, তখন সেই কবিতার ভাবনা তাঁর নিজের ভেতরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি নিজেই নতুনভাবে অনুভব করতে শুরু করেন। একটি কবিতা কখনো কখনো মানুষের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। কখনো একটি লাইন আমাদের নিজের স্মৃতিকে স্পর্শ করে। কখনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের কোনো গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এই মুহূর্তে আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে আত্ম-অনুসন্ধানের একটি পথ। আমরা শব্দের ভেতর দিয়ে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি। ধ্যানের দরজা শব্দ, শ্বাস ও নীরবতা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আবৃত্তি এই তিনটি উপাদানকে একত্রে নিয়ে আসে। শব্দ আমাদের মনোযোগকে জাগিয়ে তোলে। শ্বাস আমাদের কণ্ঠকে ছন্দ দেয়। আর নীরবতা আমাদের অনুভূতিকে গভীর করে। এই তিনটি একত্রে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় ধ্যানের কাছাকাছি। যদি আমরা সচেতনভাবে আবৃত্তি করি, যদি আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, এবং যদি আমরা নীরবতার মূল্য বুঝতে শিখি, তাহলে কবিতা আমাদের মনকে শান্ত করার একটি পথ হয়ে উঠতে পারে। ১. কীভাবে আবৃত্তির ভেতরে ধ্যানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়; ২. কীভাবে শ্বাস ও কণ্ঠকে প্রস্তুত করা যায়; এবং ৩. কীভাবে কবিতা আমাদের অন্তরের নীরবতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ, কখনো কখনো একটি কবিতার কয়েকটি শব্দই মানুষের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। আর সেই স্পর্শ থেকেই শুরু হতে পারে একটি নতুন যাত্রা — শব্দ থেকে নীরবতার দিকে, কণ্ঠ থেকে হৃদয়ের দিকে, এবং অনুভূতি থেকে ধ্যানের দিকে। শব্দ থেকে নীরবতার পথে মানুষের জীবনে শব্দের উপস্থিতি চিরন্তন। জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা শব্দের মধ্যে বাঁচতে শুরু করি। প্রথম কান্না, প্রথম ডাক, প্রথম উচ্চারণ — সবকিছুই শব্দের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। শব্দ আমাদের অনুভূতির বাহন। আমরা আনন্দ প্রকাশ করি শব্দে, দুঃখ প্রকাশ করি শব্দে, ভালোবাসা জানাই শব্দে। কিন্তু শব্দের আরেকটি গভীর দিক আছে, যা আমরা সব সময় লক্ষ করি না। শব্দ আমাদের অন্তরের দরজাও খুলে দিতে পারে। কবিতা সেই দরজার একটি বিশেষ চাবি। কবিতা যখন আমরা পড়ি বা শুনি, তখন অনেক সময় এমন অনুভূতি জন্ম নেয়, যা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি ছোট্ট পঙক্তি হঠাৎ আমাদের মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দিতে পারে। আবার কোনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের গভীর স্মৃতিকে স্পর্শ করতে পারে। এ কারণেই কবিতা শুধু সাহিত্য নয়; এটি মানুষের অন্তরের একটি অভিজ্ঞতা। যখন সেই কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে উচ্চারিত হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবৃত্তি একটি বিশেষ শিল্প। এখানে শব্দ কেবল উচ্চারিত হয় না; শব্দ অনুভূত হয়, শ্বাসের সঙ্গে ছন্দ তৈরি করে, এবং নীরবতার সঙ্গে মিলেমিশে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তখন তিনি কেবল একটি লেখা পাঠ করেন না, তিনি সেই কবিতার অনুভূতিকে জীবন্ত করে তোলেন। এই জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতরে আমরা কখনো কখনো এমন একধরনের শান্তি অনুভব করি, যা ধ্যানের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। ধ্যান বা মেডিটেশন সাধারণত আমরা ভাবি — চোখ বন্ধ করে বসে থাকা, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করা, অথবা শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। কিন্তু ধ্যানের মূল অর্থ আরও গভীর। ধ্যান হলো সচেতনতা। ধ্যান হলো বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে থাকা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবৃত্তিও একটি ধ্যানের পথ হতে পারে। যখন আমরা একটি কবিতা ধীরে ধীরে আবৃত্তি করি, যখন আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, যখন আমরা শব্দের মাঝখানের নীরবতাকেও গ্রহণ করি, তখন আমাদের মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। শব্দ তখন কেবল শব্দ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি যাত্রা। যাঁরা কবিতা ভালোবাসেন, যাঁরা শব্দের ভেতরে শান্তি খুঁজে পান, অথবা যাঁরা ধ্যানের নতুন একটি পথ খুঁজছেন। কারণ, কখনো কখনো ধ্যান শুরু হয় কোনো জটিল সাধনার মাধ্যমে নয়, বরং একটি সহজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একটি কবিতা শোনার মাধ্যমে।
(প্রথম পর্ব) একদিন সম্পর্কের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারটা অদ্ভুত! সেখানে আলু-পেঁয়াজ, কাপড়-চোপড়, সোনা-রুপা কিছুই বিক্রি হয় না। শুধু সর্ম্পক। ছোট ছোট দোকানে সাজানো আছে মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, আত্মীয়তা, স্বার্থ, ক্ষমতা, যেন মানুষের জীবনকে টুকরো টুকরো করে তুলে রাখা হয়েছে। একজন দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকাল— কী চাই? আমি বললাম— একটু সর্ম্পক। সে হেসে বলল— কোনটা? মানবতার, না ভালোবাসার? বিশ্বাসের, না ব্যবসার? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম— বন্ধুত্বের। লোকটা তখন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। যেন বহুদিন পরে কোনো বিলুপ্ত শব্দ শুনেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল— জনাব, পৃথিবী এখনো যে কটা কারণে টিকে আছে, বন্ধুত্ব তার মধ্যে একটা। কিন্তু দুঃখিত, এই জিনিসি বিক্রির জন্য নয়। সেদিন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা বোধহয় সত্যি কথা বলেছে। চারপাশে কত মানুষ! বিমানবন্দরে মানুষ, রেলস্টেশনে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ, অফিসে মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। কিন্তু বন্ধু? বন্ধু যেন বর্ষার দিনে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একা কদমগাছ। আছে কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। প্রবাসে এসে এই অভাবটা আরও বেশি টের পাই। একেক দিন শরীর ভালো থাকে না; একেক দিন মন। আবার কোনো কোনো দিন দুটোই ভালো থাকে না। সেই দিনগুলোতে খুব ইচ্ছে করে পাশে বসে কেউ নির্বিকার মুখে এক কাপ চা খেতে খেতে বলুক— তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষ দিন আজ। তারপর দুজন মিলে হাসতে হাসতে পৃথিবীর শেষ দিনটাও পার করে দেয়া যেত। এখানে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে খয়েছি, গল্প করেছি, লং ড্রাইভে গিয়েছি, ইউরোপের পুরোনো শহরে হাঁটাহাঁটি করেছি, আমেরিকার সরল রেখার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পরিচয় হয়েছে অনেক, বন্ধুত্ব হয়নি তেমন। আজকাল সর্ম্পকগুলো কেমন যেন মোবাইল ফোনের অ্যাপের মতো। ডাউনলোড করা যায় সহজে, আবার ডিলিট করাও সহজ। একটি অপছন্দের মন্তব্য। একটি ভিন্ন মত। একটি না-পছন্দ সিদ্ধান্ত। ব্যস, সম্পর্কের সমাপ্তি। তখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। তারা ছিল অন্য রকম। আমাদের কাছে তখন পৃথিবী ছিল ছোট। কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল বিশাল। আমাদের জাতিসংঘ ছিল না, ছিল বন্ধুসংঘ। আমাদের পাখা ছিল না, কিন্তু উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানোর সময় ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় ছিল। বৃষ্টির শব্দ শোনার সময় ছিল। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না গুনে গুনে ভোর করে দেয়ার সময় ছিল। আমরা তখন জানতাম না পৃথিবী কত জটিল! জানতাম না মানুষ একদিন এত ব্যস্ত হয়ে যাবে। শুধু জানতাম, বিকেলে মাঠে দেখা হবে। এই জানাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আজ বুঝি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিস নয়, সময় হারায়। আমি বাংলাদেশকে যতটা মিস করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি বাংলাদেশের কিছু সময়কে। ঝুমবৃষ্টির দুপুর। বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। শীতের সকাল। ডিমভরা পুঁটি মাছ ভাজা ঘ্রাণ। ধানখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিকেল। আর মিস করি সেই সব মানুষকে যাদের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যেত। একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল— বাংলাদেশে যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব? আমি বলছেলিাম— যদি পারিস, চৈত্রদিনের একটা ঘুঘু-ডাকা দুপুর নিয়ে আয়। সে ভেবেছিল আমি মজা করছি। আসলে করিনি। মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন সে বস্তু নয়, মুহূর্ত সংগ্রহ করতে চায়। আমাদেরও মনে হয় সেই সময় এসেছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও কোনো ঘড়ি ছিল না। আম্মা শুকতারা দেখে ভোরের সময় আন্দাজ করতেন। তারপর আমাকে ডাকতেন। আমি আধোঘুমে চোখ খুলে বলতাম— এখনো তো অন্ধকার। আম্মা বলতেন— আগে শুরু কর বাবা। পড়তে পড়তে সব আলো হয়ে যাবে। বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখনো পড়ছি। কতটুকু আলো হলো জানি না। তবে এটুকু বুঝেছি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলোগুলো বই থেকে আসে না। আসে মানুষ থেকে। বন্ধু থেকে। ভালোবাসা থেকে। স্মৃতি থেকে। এই যে আজ এত দূরে বসে আছি, হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পাসের কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বন্ধুরা পাশে আছে। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে। কেউ আবার অবলীলায় পকেট থেকে শেষ দশ টাকা বের করে সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে। সেই সব বিকেল কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই মানুষগুলো? আমরা কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি? নাকি শুধু দূরে সরে গেছি? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ সম্পর্কগুলো অনেক সময় নিয়মিত যোগাযোগে বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে বিশ্বাসে। কোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না। তার পরও গভীর রাতে ফোন করলে সে বলবে— বল, কী হয়েছে? এবং এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের অভিধানে ‘কেন’ শব্দটা খুব কম থাকে। সেখানে থাকে শুধু— ‘আমি আছি।’ [চলবে]
কল্পনার আকাশ সীমাহীন। যেন এক মহাসমুদ্র। চিত্রকল্প এর ঐশ্বর্য। তীব্র অনুভূতির সৌন্দর্য। একটি নান্দনিক কবিতায় থাকে নানা রকম বৈচিত্র্যের সমাহার। থাকে গোধূলির মায়া। দিগন্তের হাতছানি। আকাশের নীল। সমুদ্রের গর্জন। শরতের মেঘ। বৃষ্টির শব্দ। হেমন্তের হাসি। বসন্তের প্রজাপতি। নিসর্গের মায়া। এসবই একজন কবির চিত্রকল্পের ক্যানভাস। চিত্রকল্প একেবারেই যে অনিবার্য তা হয়তো না। চিত্রকল্প ছাড়াও কবিতা জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু আধুনিক কবিতার দাবি ভিন্ন। চিত্রকল্প ছাড়া আধুনিক কবিতা অনেকটা অসম্পূর্ণ। চিত্রকল্পকে মনে করা হয় কবিতার প্রাণ। এটা কল্পনার রঙিন ছবি। শব্দের অপূর্ব বিন্যাস। কবির উপলব্ধি যখন মূর্ত হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় চিত্রকল্প। ইংরেজিতে বলে ইমেজ। বাংলায় শব্দের জাদু। চিত্রকল্প আত্মার সংকেত। একধরনের ইশারা। অলংকারের নিপুণ কারুকাজ। তুলনার ঊর্ধ্বে এর অবস্থান। উপমা শব্দের অংশ মাত্র। চিত্রকল্প বিষয়ের নির্যাস। এক চিত্র থেকে অন্য চিত্রে উত্তরণ ঘটে অনায়াসে। ভালো কবিতায় প্রেম-বিরহ, দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ সবই চিত্রকল্পময় হয়ে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ ও পারোক্ষ হতে পারে। পরোক্ষ চিত্রকল্প পাঠক হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। এটি সার্থক কবিতার শ্রেষ্ঠ গুণ। উপমার আড়ালে লুকানো ছবি। অব্যক্ত কথার আড়ালে গভীর কথা। মিথের অপূর্ব মেলবন্ধন। চিত্রকল্প যেন স্বপ্নের রাজ্য। সত্যের সাথে স্বপ্ন মিশে একাকার। কবি স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। তিনি দেখেন অতীতের ধূসর ছায়া। দেখেন ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলো। তাঁর ভাবনায় উজ্জল হয়ে ওঠে অনাগত দিনের সুর। তিনি প্রচলিত ছক ভেঙে লেখেন। অজানার ডাকে ছুঁয়ে যান নতুন দিগন্ত। সত্যের জয়গান গাইতে হয় অমোঘ সুরে। আর তখনই কবিতার শক্তি হয় অমর, অজেয়। চিত্রকল্পের রূপান্তর ঘটে অবিরাম। সময় বদলে যায়। আঙ্গিক পাল্টে যায়। শব্দের ব্যবহার হয় আধুনিক। ছন্দের চলন হয় নতুন ছন্দে। এই বদল স্বাভাবিক। একে মেনে নিতে হয়। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি চিরকাল সবার প্রিয়। সময়কে জয় করাই শিল্পের চূড়ান্ত সাফল্য। কবিতা সেই ধ্রুবতারা, যা অন্ধকারে পথ দেখায়। জীবনের বাতিঘর। কবিতা শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, এটি জীবন দর্শন। অমরত্বের স্বপ্ন। চিরন্তন সত্যের আলো, আর চিত্রকল্প এর আত্মা। বিচিত্র ভাবনার জগতে বাস করেন একজন কবি। তিনি তাঁর সময়কে উপেক্ষা করতে পারেন না। চারপাশের যন্ত্রণার দহন। শোষিতের আর্তনাদ। বেদনার অশ্রু। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। শাসকের অহংকার। পাহাড়ের মায়া। রাতের নির্জনতা। অমানবিকতার অন্ধকার - সবই তিনি দেখেন। অনুভব করেন। কবিতায় ধারণ করেন। চিত্রকল্পের অসীম প্রান্তরে কবির বিচরণ। কল্পনার এই অলৌকিক শক্তি জন্ম দেয় কালজয়ী কবিতা। চিত্রকল্প ছাড়া কবিতা প্রায় প্রাণহীন। কল্পনাই কবিতার শক্তি। শুধু চিত্রকল্পই না, কবিতার ভাষা ও বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রকল্পা ভাষা ও বিষয়ের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত হয় এক নান্দনিক কবিতা। তা না হলে কবিতার সৌন্দর্য হারায়। ভালো কবিতার জন্য প্রয়োজন চিত্তের শুদ্ধতা। হৃদয়ের গভীরতা। অলংকারহীন কবিতা পাথরের মতো প্রাণহীন। আধুনিক পাঠক সচেতন। তাঁরা কবিতায় চিত্রকল্প দেখতে চান। চিত্রকল্প একটা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছন্দ ও শব্দের ব্যঞ্জনা। ছন্দ মানেই গতি। অসীমের পথ। রবীন্দ্রনাথ গদ্য ছন্দের অমর স্রষ্টা। তাঁকে বলা হয় গদ্য কবিতার আলোর মশাল। তিনি অন্তমিলের শেকল ভাঙেন। কবিতায় আনেন মুক্তক ছন্দ। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেন গদ্যের নতুন জগৎ। মৃদু ঢেউয়ের মতো গদ্যের দোল থাকে। একেই বলে কবিতার প্রবহমানতা। এখানে অবাধ স্বাধীনতা। পাখির মতো উড়ে চলা। নীল আকাশের মতো আবেগের জোয়ার। ধ্বনি, পর্বের বন্ধন ও আলোর খেলা। কল্লোল যুগের কবিরা তো বরীন্দ্রনাথেরে বিরুদ্ধে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরাও রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথে গদ্য কবিতা লেখেন। কবিরা হয়ে ওঠেন ভাষার সার্বভৌম রাজা। বাংলা কবিতা পেল ভিন্নমাত্রা। শুরু হলো গদ্য কবিতার জয়যাত্রা। কিন্তু গদ্য অথবা পদ্য, ছন্দ অথবা ছন্দহীন যে কবিতাই হোক না কেন, চিত্রকল্প এর এমন এক ঐশ্বর্য, যা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। কবিতায় গুরুচণ্ডালী ভাব যেন না থাকে, সেদিকটায় সতর্ক থাকতে হয়। তবে কখনো কখনো সাধু-চলিতের মিশ্রণ হতে পারে, যদি তা ছন্দ ও কবিতার সৌন্দর্য রক্ষায় অপরিহার্য হয়। সাধারণত কবিতা হয় প্রতীকী। এখানে রূপকের গভীর ইশারা থেকে। গভীর অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক অর্থ। কবির গভীরতম অনুভব চিরকাল সুন্দর, যা পৃথিবীকে করে আরও সুন্দর। মানুষকে করে আরও মানুষ। কবিতার এই জয়যাত্রা চলুক অনন্তকাল। কবি হোক শব্দের জাদুকর। কবির চিত্রকল্পের জাদুতে মোহিত হোক পৃথিবী।
অশীতিপর বৃদ্ধ ধনোপার্জনে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলে সে বলবে, সে নিজের জন্য কিছুই করে না। সবই সন্তানের জন্য। আসল কথা, সে নিজেই সন্তান-সন্ততির ভেতর দিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করবে। সন্তান যে নিজেরই নব সংস্করণ। এই যে জীবন আমাদের নিকট এতো প্রিয় এবং অমূল্য, এটাও আমরা অকাতরে না, অতি আবেগের সাথে, অতি উল্লাসের সাথে সন্তানের মঙ্গলের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছি। বিপন্ননের মাথায় কুঠারাঘাত করে, অনাথের অন্নভরা গ্রাসকে শূন্য করে, সমাজের বুকে পাথর বসিয়ে আমি সম্পদ, অর্থ, বৈভব সংগ্রহ করছি, তা কার জন্য? যার জন্য এত করেছি, সে আমার কে? অভিধান তাকে সন্তান নামে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু আমি জানি, এক হিসাবে সে আমার কিছুই নয়। কোন অজানা দেশে সে ছিল, কোন প্রভাতে ঝরা ফুলটির মতো ভেসে এল, আবার কখন জীর্ণ পাতাটির মতো পৃথিবীর বুকে মিলে যাবে, তার সাথে আমার সম্বন্ধ কী? মূর্খ লোকে বলে আমি তার জনক, আমি তার পিতা। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তার জীবনের ওপর আমার অধিকার নাই কেন? মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচাই যে তার ধর্ম। সে মরণকে মরণ বলে মানতে পারে না। তাহলে যে তার বেঁচে থাকা, জীবনধারণ অসাধ্য হয়ে পড়ে। সে বলছে, আমি বাঁচব; অনন্তকাল ধরে আমি বাঁচব, আমার আত্মা অবিনশ্বর। জীবন যেমন অনন্ত মহাযাত্রায় ছুটে চলে, যুগান্তরের ভেতর দিয়ে নিজের পথ কেটে চলছে, আত্মাও তেমনই অনন্তকাল ধরে কোনো বিশ্বে বেঁচে থাকবে, লীলাভিনয় করবে, নিজের কাজের ফল ভোগ করবে। মৃত্যু সে তো ঘাঁট মাত্র; এখানে এসে আত্মা জীবনের নিকট বিদায় গ্রহণ করে আপনার দেশে চলে যায়, আর দেহ যাত্রীহীন শকটের ন্যায় ধুলায় পড়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা এক নয়; জীবন বা জৈবশক্তি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, আত্মা নিত্য। মানুষ তো মৃতের দেশে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু সেখানে তার বাসস্থান কোথায়? মানুষ স্বর্গের দেশে বিরাট অভ্রভেদী প্রাসাদ গড়ছে, প্রাসাদের ধারে উদ্যান, অদূরে সিন্ধু ধারা, তটিনী, সাহচর্যের জন্য লাখ লাখ হুর ও গেলমান। এসবের ব্যবস্থা মানুষ পূর্বেই সেখানে করে রেখেছে। যা-কিছু সুন্দর, যা-কিছু ভোগ্য, যা-কিছু ইপ্সিত বলে মনে করেছে, সে সমুদয় দিয়েই মৃত্যুর ওপারে নিজের প্রবাস ঘাঁটি গড়ে তুলছে; তারই সে নাম দিয়েছে বেহেশত বা স্বর্গ, মরণের পরও বেঁচে থাকার এই ধারণার নানা শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হয়ে কী বিরাট মায়াজগতের সৃষ্টি করেছে। নয়ন কখনো দেখেনি সে দেশের রূপ, শ্রবণ কখনো শোনেনি সেই পুরির ছন্দ; তবু সবাই সব আশা সব কামনাকে সেই অজানা আঁধার দেশের প্রাণে নিয়ন্ত্রিত করে পৃথিবীর দারুণ বেদনার ভার বুকে নিয়ে হাসছে। মানুষ সবাই মনে করে, ইহকালের দুঃখ বরণ করে নিলে পরকালে অন্তত সুখের অধিকার আপনি এসে ধরা দেবে। কাব্য কলায়, সাহিত্য-সংগীতে, আশা-উৎসাহে, আমোদ-উপভোগ সবখানেই সেই ভাবী আকাঙ্ক্ষিত রাজ্যের জন্য প্রবল অনুরাগ ঝংকার দিয়ে উঠছে। একই বিদ্যুৎ প্রবাহ যেমন নগরীর লাখো প্রদীপের ভেতর দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করেছে, তেমনি একই মহাপ্রেরণা সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ভেতর দিয়ে কোনো দূর লক্ষ্যের পানে ছুটে চলেছে। সেই প্রেরণা মানবের ভেতর দিয়ে আপনি বেঁচে থাকতে চায়, তাই মানুষের বাঁচতে এত সাধ। আত্মাও চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। মরণ মানুষের দৈহিক জীবনে সমাপ্তি এনে দেয় না। কিন্তু আত্মা তার পরও বেঁচে থাকতে উৎসুক। তাই মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে মানুষের এত জল্পনা-কল্পনা। সংসারের এ মায়া-বন্ধন, এই আশা-ভরসা, এই উদ্যম-সাধনা, সবই মরণের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ ব্যর্থতায় মিশে যাবে। এই চিন্তা মানুষ সহ্য করতে পারে না। সোনার পুতুলি সন্তান জননীর কোল শূণ্য করে কালের নির্মোঘ আঘাতে খসে পড়ছে। সে কি কখনো আর মায়ের শূণ্য কোলে ফিরে আসবে না? আসবে! মরণের পরপারে আবার সে হাসতে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে চড়ে বসবে। তা না হলে এই বিচ্ছেদ যদি শেষ হয়, তবে জীবন যে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে! মানুষ তো সে ধারণা সহ্য করতে পারে না। ওই যে সতি নারী তার আদরের পতিকে হারিয়ে নিশিদিন অশ্রুজলে বুক ভাসাচ্ছে। সে স্বামীর ধ্যান, স্বামীর স্মৃতি জীবনের শেষ অবলম্বন ভেবে বুকে আগলে রেখেছে, এটি কি শুধু তার ব্যর্থতার জন্য? সত্য থেকে বিচ্যুতির ফলেই মানুষের বিড়ম্বনা এবং সমাজের অশান্তির সূত্রপাত হয়। মানুষের বিশ্বাসের বিড়ম্বনা, যা মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, জীবনকে এমন স্থানে বসিয়ে দেয়, যেখান থেকে মানুষ পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় নতুন অর্থে বুঝতে বাধ্য হয়। কবি যে পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় দেখছেন, তাঁর চোখে পৃথিবীর প্রতিটি তরু-বীথিকা সুরবালাদের মনোরম আসন বলে মনে হয়। প্রতিটি পল্লবের মৃদু শিহরণ আপন মানসপটে আনন্দের হিল্লোল বয়ে দেয়। সেই পৃথিবী একজন নাস্তিকের চোখে বৃহৎ ধূলিকণার স্তূপ ভিন্ন অন্য কিছু বলে মনে হয় না। এই যে তাজমহল জগতের অষ্টম কীর্তি বলে বিশ্ববিশ্রুত, যাকে কেউ অশ্রুসৌধ, কেউ প্রেমের সমাধি বলে আখ্যাত করেছে, সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ মেজর শ্লিমানের স্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, “হায়! আমি মরলে আমার সমাধির ওপর যদি কেউ এমন স্মৃতিসৌধ গড়ে দিত, তাহলে এই মুহূর্তে মরতে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ হতো না।। সেই তাজমহলের দিকে একবার অর্থনীতিবিদের চোখে দর্শন করো, দেখবে এটি অপব্যয় ও নির্বুদ্ধিতার একটি জীবন্ত নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে ন্যায়নিষ্ঠার ভাস্বর তার চোখে এই পৃথিবীর কোথাও নিয়মের ব্যতিক্রম চোখে পড়বে না। পক্ষান্তরে যেকোনো সুনির্দিষ্ট পন্থাকে আপনপ্রবৃত্তিসমূহের প্রতিকূল ভাবে, সে জগৎকে সর্বদা নিয়মের কঠিন নিগড়ে নিষ্পেষিত বলে দুঃখ প্রকাশ করবে। দরিদ্রের অন্ন জোটে না, তবু তার ক্ষুধা হয়, প্রকৃতির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেককেই অভিযোগ করতে শোনা গেছে যে নিজে চুরির কাজে অভ্যস্ত, সে অন্যের অচুরিতে আস্থা রাখতে পারে না। ঠিক আমি যেমন, তেমনই করে আমি দুনিয়াটাকে দেখি। জীবন কী, জগৎ কী? মৃত্যুর পরে কী আছে? এসব প্রশ্ন মানুষকে সব সময় আলোড়িত করে। এ যে ভীষণ সমস্যা! জীবনে যত বিপদ আসে, সব বিপদেরই একটি সমাধান আছে, কিন্তু মরণ যে বিপদ, তার কাছে তো পরিত্রাণ নেই। এ পৃথিবী এমন করে হাসতে থাকবে, এ সংসারে কাজ-কর্ম এমন করে চলতে থাকবে, শুধু আমরা থাকব না। এ চিন্তা বড় অসহ্য। এ বন্ধুবান্ধব এমনই আমার জন্য প্রতিবছর উৎসব করতে থাকবে, কিন্তু আমি সেখানে থাকব না। কেউ হয়তো আফসোস করে দু-একবার বলবে, আহা, অমুক আজ নেই! কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। শিশুপুত্র-কন্যারা শরতের জোছনা ভরা আকাশের পানে চেয়ে ভাববে, বাবা ঐ চাঁদের দেশে আছে, হয়তো একদিন নেমে আসবে। বসন্তে যখন ফুলে ফুলে গন্ধের বন্যা বইবে, গ্রীষ্মে যখন পাকা ফলের ম-ম সুবাস চড়িয়ে পড়বে, তখন শিশুদের বাবার কথা মনে পড়বে, কিন্তু সে কয়দিন? অদূরে কল্লোলিনী এমনি করেই চিরদিন বইতে থাকবে। শৈশবের সংস্পর্শে, যৌবনের আলিঙ্গন কত না সে তার তরঙ্গ মাখিয়ে দিয়েছে! সে এমনই উদাস মনে নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দাম ক্রিয়া দেখতে দেখতে এভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।’ মানুষ দুনিয়ার সুখ সুখ করে উন্মত্ত। এই সুখ যে ক্ষণস্থায়ী, তা মানুষ ভুলে একবারও ভাবে না। যতক্ষণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের অনুসরণ করে, আত্মার বাণীকে শোনার জন্য কানকে উদগ্রীব না করে, ততক্ষণ মানুষ তা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আত্মারও একটা ক্রিয়া আছে, একটা দৃষ্টি আছে। এটি পৃথিবীর ওই অধ্রুব রাশির ভেতরে সত্যের সন্ধান খুঁজে বেড়ায়। যেখানে একটু শুচিতার সৌন্দর্য বিকশিত হতে দেখে, যেখানে একটু দানের প্রতিদান দেখে, মহত্ত্বের বেদনাশ্রু দেখে, সেখানেই আত্মা আমাদের উন্মনা হয়ে ওঠে। কোথায় যেন সে এমনই দেখে এসেছে। কোথায় যেন এমনই নিঁখুত সুষমা, এমনই সৌম্য-সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা দেখে এসেছে। লতিকার শ্যামাঞ্চলে ঢাকা কুসুমের হাসি - হাসিমুখ, জলদের নিবিড় কৃষ্ণতায় ঘেরা চপলার অসংবদ্ধরূপ সাগর-তরঙ্গের শীর্ষে শীর্ষে উচ্ছ্বসিত ফেনপুঞ্জের অনির্বচনীয় সুভ্রতা, সবই যেন কোন জন্মের সুখ্যাতি তার অন্তরের ভেতর জাগিয়ে দেয়। কোন যে সত্যের দেশ, জ্যোতির দেশ, সুষমার দেশ হতে সে কক্ষচ্যুত গ্রহের ন্যায় দুনিয়াতে খসে পড়েছে। এদের বর্ণে, ছন্দে, গন্ধে যেন সেই দেশের আভাস পাওয়া যায়। সেই দেশের বারতা দিয়ে এরা আত্মাকে উদাস করে তোলে, তাই আত্মা প্রতীয়মানকে ত্যাগ করে প্রচ্ছন্নকে পেতে চায়।
‘মেঘদূত’ আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে মহাকবি কালিদাস রচিত একটি কাব্য। এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হওয়ার কারণে অনেকের কাছেই এর পাঠ কিছুটা দুর্বোধ্য। তাই অসাধারণ এ সাহিত্যকর্মের অর্থ বিশ্লেষণ নিয়ে বিভ্রাট এড়াতে বিভিন্ন সাহিত্যিক এই কাব্যের অনুবাদ করেন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু গুণী কবি-সাহিত্যিক বহুরূপে ‘মেঘদূত’ অনুবাদ করেছেন। এ কাব্যের প্রতিটি অনুবাদের রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যময় আবেদন। এটি যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, প্রাচীন সাহিত্যের কালজয়ী এই লেখাটির ভাবগাম্ভীর্য ও তাৎপর্য ছিল অনিন্দ্যসুন্দর। ঋতুবৈচিত্র্যে বর্ষা ফিরে আসে বারবার। নবরূপে জেগে ওঠে প্রকৃতি। গাছে থোকায় থোকায় কদম ফুল ফোটে। ঝুম বৃষ্টি কিংবা মেঘলা দিনে হঠাৎ করেই আমাদের মন কেমন যেন উদাস হয়ে ওঠে। আষাঢ়ের মেঘ-বৃষ্টি, প্রিয় মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয় বারবার। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এখন আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের সাথে মুহূর্তেই মনের আবেগগুলো শেয়ার করতে পারি। হৃদয়ের কথা মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রিয় মানুষটির কাছে। কিন্তু ধরুন মুঠোফোন বা ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার যদি না থাকত, তাহলে কী করতেন? কী করে জানাতেন তখন এই পাগল করা আষাঢ়ের রূপ দেখে প্রিয় মানুষটিকে আপনার মনের কথা? বর্ষার বৃষ্টিস্নাত দিনগুলো প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের মনেও যোগ করে নতুন মাত্রা। তাই বর্ষাকে ঘিরে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা রচনা করেছেন দারুণ সব কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস। বহু বছর আগে আষাঢ়ের এমনই এক দিনে প্রেয়সীর কাছে বার্তা পাঠানোর আকুলতাকে ঘিরে মহাকবি কালিদাস রচনা করেছেন বর্ষাকাব্য ‘মেঘদূত’, যা সংস্কৃত সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু ভাষা, সাহিত্য ও মানুষের হৃদয় গহিনে জায়গা করে নিয়েছে। আর ‘মেঘদূত’-এ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে বর্ষায় মানব মনের গভীর আকুলতা। মূলত বিরহ, অপেক্ষা আর প্রেয়সীর কাছে মনের কথা বা বার্তা পাঠানোর আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে অসাধারণ এ কাব্য। 'মেঘদূত’ কাব্যের মূল চরিত্রে আছে যক্ষ এবং তার পত্নী। তাদের নিবাস অলকা নগরীতে। যক্ষ ছিল রাজা কুবেরের সেবায় নিয়োজিত এক সেবক। সে ধনপতি কুবেরের বাগান দেখাশোনা করত। কিন্তু একদিন যক্ষ বাগান অরক্ষিত রেখে তার স্ত্রীর কাছে গেলে হাতির পাল সেই বাগানে ঢুকে বাগান নষ্ট করে দেয়। আর এ কারণে যক্ষ তার প্রভু কুবেরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এক বছরের জন্য নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। প্রিয়ার বিরহে যক্ষের নির্বাসিত সময় কাটতে থাকে রামগিরিতে। ঋতু পাল্টে আসে আষাঢ় মাস। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে মেঘের আগমনে প্রকৃতির নিয়মেই যক্ষের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তার প্রিয়ার জন্য। বিরহী যক্ষ তখন মেঘের কাছে অনুনয় জানায়, তার মনের গভীরে থাকা কথা অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। আর যক্ষ প্রিয়ার কাছে মেঘকে দূত করে বার্তা পাঠানোর কাহিনিকে উপজীব্য করেই রচিত হয়েছে মহাকবি কালিদাস রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের বহুল সমাদৃত কাব্য ‘মেঘদূত’। বিশিষ্ট কবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্য রচনা করেছেন ১১৮টি শ্লোকে এবং তা দুটি খণ্ডে ভাগ করেছেন; উত্তরমেঘ ও পূর্বমেঘ। পূর্বমেঘের প্রথম অংশে মেঘদূত কাব্যের ঘটনাপ্রবাহের শুরু, এই অংশেই দেখা মিলবে মেঘদূত কাব্যের নায়ক যক্ষের সাথে। এরপর পর্যায়ক্রমে এসেছে তার প্রেয়সী ও অলকা নগরীর কথা। সদ্য বিবাহিত যক্ষ আর তার পত্নীর নিবাস অলকা নগরীতে। এরপর কাহিনির মোড় নিতে আগমন হয়েছে যক্ষের প্রভু ধনদেবতা কুবেরের। ঘটনাপ্রবাহে যক্ষ নির্বাসিত হয় রামগিরিতে। আর এখান থেকেই গল্পের মূল অংশ। নির্বাসিত যক্ষ রামগিরি থেকে অলকা নগরীতে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠানোর জন্য মেঘের কাছে জানায় আকুল আবেদন। এ ঘটনা প্রবাহের বিপরীতে পূর্বমেঘের মূল আকর্ষণ হচ্ছে রামগিরি থেকে অলকা নগরীর মেঘের যাত্রাপথের বর্ণনা। মেঘ যখন যক্ষের বার্তা নিয়ে অলকা নগরীর দিকে যাবে, সেই যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে কাব্যের শ্লোক ১৬ থেকে ৬৪ পর্যন্ত। পূর্বমেঘের এই অংশে অলকা নগরীর যাত্রাপথের সৌন্দর্য বর্ণনা দিতে কবি ব্যবহার করেছেন অনিন্দ্যসুন্দর সব উপমা আর ফুটিয়ে তুলেছেন রামগিরি থেকে অলকা নগরী পর্যন্ত অখণ্ড ভারতের অসাধারণ রূপ। পূর্বমেঘ পড়তে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠবে অলকা নগরীর যাত্রাপথে উজ্জয়নী, অবন্তি অথবা বিদিশা নগরীর দৃশ্য; কিংবা কানে বেজে উঠবে রেবা, শিপ্রা ও বেত্রবতী নদীর বহমান জলধারার কলকল ধ্বনি এবং ভেসে আসবে নদীতীরের ভুঁইচাপা ফুলের সুবাস। আবার ‘পূর্বমেঘ’ পড়তে পড়তে সন্ধ্যা নামতে পারে বিন্ধ্য, কৈলাস কিংবা দেবগিরি পাহাড় চূড়ায়। আবার কখনো হারিয়ে যাওয়ার সাধ জাগে মেঘের যাত্রাপথের কেতকী বনে। পথিমধ্যে দেখা মিলবে আনন্দিত চাতকের দলের সাথে। আর বইয়ের পরতে পরতে মুগ্ধতা ছড়াবে বর্ষার স্নিগ্ধ সতেজ কদমগুচ্ছ ফুলের সৌরভ। এরপর উত্তর মেঘের বর্ণনায় বহু নগর, পাহাড়, নদী আর বন পেরিয়ে মেঘ পৌঁছায় অলকা নগরীতে। পূর্বমেঘজুড়ে অলকা নগরীর যাত্রাপথের বর্ণনা শেষ হওয়ার পর দেখা মেলে যক্ষপ্রিয়ার বাড়ির। উত্তর মেঘের বর্ণনায় পাঠকের মানসপটেও সেই বাড়িটি ভেসে উঠবে অবিকলভাবে। মেঘ যখন কুবেরের বাড়ি পৌঁছবে, তখন দেখা মিলবে বাড়ির পাশের উঠোনে থাকা মন্দার গাছটির। আর কিছুদূর পাশেই আছে পান্নাশোভিত চমৎকার একটি হ্রদ, যেখানে তখন ভেসে বেড়াবে হাঁসের দল আর নীলকান্তমণি শোভিত পদ্মের কাণ্ডে ছেয়ে থাকবে সেই পুরো হ্রদ। এভাবেই অলকাপুরী আর যক্ষের বাসগৃহের বর্ণনার পর দেখা মিলবে যক্ষপ্রিয়ার। হালকা গড়নের ঈষৎ শ্যামলা বর্ণ; এমনভাবেই তার রূপের বর্ণনা শুরু হয়েছে। এরপর বহু উপমা আর রূপে রঞ্জিত হয়েছে যক্ষপ্রিয়া। শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনাই নয়, যক্ষের বিরহে বিনিদ্র রজনী পার করে যক্ষপ্রিয়ার মলিন দশাও বর্ণিত হয়েছে এক দারুণ ভঙিমায়। এরপর মেঘ পৌঁছে যায় যক্ষপ্রিয়ার কাছে এবং তাকে পৌঁছে দেয় বহু প্রতীক্ষিত যক্ষের বার্তা। এভাবেই প্রেয়সীর কাছে যক্ষের বার্তা পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই ‘মেঘদূত’ কাব্যটি তার নামের সার্থকতা পায়। প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল নিদর্শন অনবদ্য এক মনোমুগ্ধকর সৃষ্টি, মহাকবি কালিদাসের কালজয়ী এই মহাকাব্য ‘মেঘদূত’ যেমন সমাদৃত হয়েছে সাহিত্যাঙ্গনের সর্বক্ষেত্রে, তেমনি পাঠক হৃদয় জয় করেছে যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আজ আর প্রাচীনকাল বা মধ্যযুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুগ ছাড়িয়ে উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে বেশ আগে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের পরিক্রমায়, মন-মননের চিন্তাভাবনা ধ্যানধারণায় বৈশ্বিক মেরুকরণের আবর্তনে বা বিবর্তনে সগৌরবে মর্যাদার আসনে আসীন। যেখানে পরিবর্তনই সময়ের ধর্ম, বিপর্যয়ও সেখানে মহিমান্বিত। হোক গদ্য কিংবা পদ্যের ভাষা; ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সবিস্তর। শাসন-শোষণে ঔপনিবেশিক হিংস্রতার পরিমাণ অপরিমেয়। ধ্বংসযজ্ঞের করুণ পরিণতি সীমাহীন। বাঙালির রক্তে ভেজা মাটি সাত সমুদ্রের মতো। প্রবল বন্যায় সবকিছু যেমন ভাসিয়ে নেয় কিংবা ভূমিকম্পের তীব্রতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বস্তুগত-অবস্তুগত তথা প্রাণের বিপর্যয় ঘটে, অস্তিত্ব মুখথুবড়ে পড়ে, সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অক্ষত থাকার চিন্তা বাহুল্য। মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কৃত্রিম দুর্যোগ বিপর্যয়ের চরম ধ্বংসাত্মক শক্তির দুই ভাই। এক ভাইয়ের আক্রমণে কিছু থাকে তো আরেক ভাইয়ের আক্রমণে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার বারোটা বাজে। বাংলার সংস্কৃতি ও বাংলা গদ্যের বেলায়ও ঠিক তেমন। বিজাতি বা বিভাষী হলো দুর্যোগ, কিন্তু দুর্যোগেরও একটা উপকারী দিক থাকে। যেখানে উর্বরতা বাড়ে, সেখানে ফসল ফলানোও যায় ভালো। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিজাতীয় ভাষা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কী পরিমাণ অবদান রেখেছে, সেটা সাহিত্যের আদিমতম ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। তাই দুর্যোগের পরও কিছু নতুনত্ব থাকে। এই রূপান্তরের বিবর্তন পর্যায়ক্রমে জ্ঞাত হওয়া যায় ভাষা ও সাহিত্যের আদি গ্রন্থগুলোর পণ্ডিতদের মতামত ও বিভেদের আলোচনা-সমালোচনা থেকে। বাংলা ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য বা গুণ সহজ-সরল, সাবলীল, প্রাঞ্জল, অসংযতহীন ও ধ্বনিমাধুর্য লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে বাংলা গদ্যে দুর্বোধ্যতা ও জটিলতা পরিলক্ষিত হয়; যার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশ্চাত্য প্রভাব আর বিজাতি ও বিভাষীয় ক্ষমতার প্রভাবে বাংলা ভাষার প্রাণস্পন্দন, শেকড় বা নাড়ির টানের ব্যবচ্ছেদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস চর্যাপদ থেকে ধরা হলেও শুভযাত্রা তারও অনেক পরে। মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও রামগতি ন্যায়রত্নের ‘বঙ্গ ভাষার ইতিহাস’ ও ‘বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থ দুটিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করলে কোনটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম আলোচিত গ্রন্থ, তা নিয়ে মতভেদ লক্ষ করা যায়। তবে সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় লেখার শিরোপা বা মুকুট চর্যাপদের লেখক মীননাথকেই দিতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ পদ্মনাভ ঘোষাল ও অবিনাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘গৌড়ীয় ভাষাতত্ত্ব’ (১৮৭৫), রাজনারায়ণ বসুর ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা’ (১৮৭৮), হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বর্তমান শতাব্দীর বাঙ্গালা সাহিত্য’ (১৮৮১) এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে এবং নানা মতভেদের আলোকে বলা যায়, বাংলা গদ্য সাহিত্যের যাত্রা উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছিল। অনেকে বাংলা গদ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন ষোড়শ শতাব্দীতে ‘বাংলা সাহিত্য’ সূচনার মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ বলেন বৈষ্ণব সাধনতত্ত্ব বিষয়ক গদ্যগ্রন্থকে। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসকে বাংলা গদ্যের আদি লেখক বলা হলেও মতভেদ রয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী কালকে সজনীবাবু অন্ধকার যুগ বলেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্ধকার যুগে হয়তো তেমন কোনো সাহিত্যকর্মের নিদর্শন পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু তার পরও এই সময়ে প্রাপ্ত ও রচিত প্রধান সাহিত্য ও নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাক ও খনার বচন, প্রাকৃতপৈঙ্গল, শূন্যপুরাণ ও সেকশুভোদয়া। সজনীবাবু নবম শতাব্দী সময়কাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের অভাববোধ করেছেন। যদিও পর্তুগালের লিসবনে প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ (১৭৪৩) মুদ্রিত হয়। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্য ভাব ও কাজের গদ্য নিদর্শন প্রতীয়মান। কারণ, এ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতানি আমলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ষোড়শ ও সতেরো শতকে সুলতানি আমলে নবাবদের মৌঠুহর অঙ্কিত বাংলা লেখায় জয়পুত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একই শতাব্দীতে আসাম, ত্রিপুরা ও কাছাড়ের মতো রাজ্য বা প্রদেশের সরকারি কাজকর্মের ভাষাও ছিল বাংলা, যা মহারাজ নারায়ণের পত্রেও দেখা গেছে। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, প্রাচীন বাংলা গদ্য সাহিত্য আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যকে বিকশিত করেছে। বাংলা গদ্যের এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মবিকাশে এবং জীবন জিজ্ঞাসার তাড়নায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাভাবনা, চেতনা, ভাবের গভীরতা ও ভাবের বাহনই ছিল গদ্য। গদ্য যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক, তর্ক-বিবাদ, বিচার-বিশ্লেষণের ভাষা, আর পদ্য আবেগ, অনুভূতি, উচ্ছ্বাস ও কল্পনার ভাষা। বাংলা গদ্যের বিকাশে পয়ার ছন্দের একটা আধিপত্য ছিল। অন্যদিকে গদ্য-পদ্যরীতিতে সাম্যভাবমূলক মিলন দেখা যায়, যার মাধ্যমে আখ্যায়িকা বিবৃতি, প্রথাবদ্ধ দেবার্চনা বর্ণনা, বাদপ্রতিবাদ ও কথোপকথন প্রভৃতি কাব্যাঙ্গে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কাব্যোৎকর্ষের মানদণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। এটা গুণগত দিক থেকে মানসম্মত না হলেও এর উপযোগিতা অসাধারণ ও অসামান্য।, যা কাব্যজগতের ত্রিশংকু কবিতার স্বর্গ এবং গদ্যের মর্ত্য বলেই বিবেচিত। রেনেসাঁসের আগে ইউরোপের কোথাও পুরোপুরি সাহিত্যিক গদ্যের বিকাশ ঘটেনি। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের ইংরেজি সাহিত্যে সাহিত্যিক গদ্য ছিল না। ইংরেজি সাহিত্যে গদ্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীতে ড্রাইডেনের হাতে, তা-ও পদ্য সাহিত্য মারফতে। এর আগে শেকসপিয়ার ও বেকনের গদ্যটাও ছিল কাব্যগদ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে প্রসার ঘটতে থাকে মুদ্রাযন্ত্রের ইংল্যান্ডের হাত ধরেই। ফলে গদ্যের পথ প্রসারিত হতে থাকে। উন্মুক্ত হতে থাকে। প্রসার ছড়িতে পড়তে থাকে ইন্টারনেটের মতো বিশ্বব্যাপী। স্বাধীন বাংলাদেশের গদ্যের বিকাশও স্বাভাবিকভাবে এর আওতাধীন হয়ে পড়ে। মুদ্রণ ও পুস্তক ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। আলতুস, মানুটিয়াস, প্রথম ফ্রান্সিস নাভাবের রানি, মার্ঘারেটের মতো ব্যক্তিরা তখন খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে মার্গারেট ইতালির স্টাইলে রচনায় উদ্বুদ্ধ করতেন, যা পরে ফরাসিরা লুফে নেন। ফরাসি গদ্যের নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রসার লাভ করতে থাকে।
জীবনকে একেকজন একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। বয়স, লিঙ্গ, সময়, প্রতিবেশ ভেদে জীবনের সংজ্ঞা ভিন্ন হয়ে থাকে। একেবারে অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থায় জরা-ব্যাধি যখন চতুর্দিক দিয়ে আক্রান্ত করে, যখন মুড়ি খাওয়ার মতো করে ওষুধ গিলতে হয়, হাসপাতাল আর ক্লিনিকে টানাহেঁচড়া করতে করতেই জান বের হওয়ার উপক্রম হয়, তীব্র শ্বাসকষ্টে অক্সিজেন মাস্ক বা সিলিন্ডারে মুখ গুঁজে রাখতে হয়, ডায়াবেটিসের প্রবল উৎপাতে কোনো চিকিৎসাই যখন স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করা যায় না, তখন যাপিত জীবনের অর্থ আর যাই হোক তাতে মধুরতার লেশমাত্র থাকে না। তখন সেই জীবন ভারবাহী জীবন্ত লাশ হয়ে ওঠে, মনে হয় এ যাতনার অবসান হোক, মৃত্যু যেন এর চেয়ে অনেক বেশি প্রশান্তির। অথচ সুন্দর এ ভুবন ছেড়ে চলে যেতে কারও মন চায় না। একটা জীবন সময়ের সাথে সাথে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানসিক বিকাশের সাথে সাথে স্বপ্নের জাল বুনতে শেখায়। ছেলেবেলায় স্বপ্নেরা পুতুল খেলার মতো হরহামেশাই রঙিন প্রজাপতির মতো কেবলই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। তখন বাসের ড্রাইভারকে দেখে মনে হয় এটাই পৃথিবীর সেরা পেশা। আহা, আমি যদি হতে পারতাম! গাড়ি নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম। আকাশ দিয়ে হাওয়াই জাহাজ উড়ে যেতে দেখলে মনে সাধ জাগত, আহা যদি পাইলট হতে পারতাম! মা-বাবা, পরিবার, সমাজ এসে তখনই ছবক দিয়ে বলত, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। সেটাকেই অভীষ্ট ধরে কত অধ্যবসায়, কত লেখাপড়া, কত কত পরীক্ষা! মাস্টার মশাইয়ের কানডলা খাওয়া, লজ্জার মাথা খেয়ে ক্লাসরুমে বা স্কুল বারান্দায় বা প্রচণ্ড রোদে স্কুলমাঠে প্রকাশ্যে নীলডাউন হয়ে বা দুই কান ধরে এক পা উঁচিয়ে অন্তহীন দাঁড়িয়ে থাকা ছিল যেন সুস্থ জীবনের প্রয়োজনে ‘স্বাভাবিক’। পারিবারিক শিক্ষা তো ছিল আরও কঠোর। সবকিছু ওই মানুষ হিসেবে জীবন গড়ার জন্য। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বপ্নের দ্রুত বাঁক পরিবর্তন হতে থাকে। পড়াশোনা শেষে বাস্তবের জগতে পা রেখেই জীবনের অর্থ কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হয়। সেই থেকে স্বপ্নরা অধরা হতে শুরু করে। জীবনজীবিকায় কেউ সফলকাম হয়, কেউ মন্দের ভালো হিসেবে ‘যা পাওয়া যায় তা-ই সই’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। সেখান থেকেই স্বপ্নের তেজস্বতা ম্রিয়মাণ হতে থাকে। সংসারে যারা কামিয়াব হতে পারে না, তাদের জন্য ওপরের আকাশ দেখা বারণ, তাদের জন্য পায়ের নিচের জমিন শক্ত কংক্রিটের মতো দুঃসহ হয়ে ওঠে। সংসারজীবনে প্রবেশের পর জীবনের ‘লাইফ লাইন’ লাইভ সাপোর্টে থাকা রোগীর মনিটরের কার্ভের মতো অস্থিরমতি হয়ে ওঠে। প্রেমে জীবনের অর্থ একরকম, সফলতায় এর পুলক ‘হ্যাপি টু দ্যা পাওয়ার ইনফিনিটি’। ব্যর্থতায় তা মাঝ আকাশে বিধ্বস্ত বিমানের মতো ছিন্নভিন্ন। পেশাগত জীবনে কেউ রতি সুখের মতো চরম পুলকিত, কেউ সো সো, আর কেউ জন্ম থেকেই জ্বলছিবৎ। কেউ সফল স্বামী, কেউ পয়মন্ত বউ। কেউ অথর্ব গাধা, কেউ অপয়া। কেউ যেন শূন্যতাকেই বয়ে বেড়ায়, কেউ অল্পকে সম্বল করেই ভালো আছি বলাতে ধাতস্থ। কারও আছে অঢেল, অগণিত। কারও থোরা থোরা আর কারও তা অধরা। সবই একজীবনে পাশাপাশি চলার চালচিত্র। একজীবনের জন্য আমাদের কত কিছুর আয়োজন! আমাদের বিদ্যা লাগে, ভালো সার্টিফিকেট লাগে। তার জন্য কত মেহনত, কত কিছুর জোগাড়পাতি লাগে। কারও চাকরি লাগে, কারও ব্যবসা। তা না হলে জীবন চলে না। তাই পরীক্ষা দিতে হয় পদে পদে। ঘাটে ঘাটে বিছানো প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয় জীবনব্যাপী। আমাদের সুখপাখি লাগে, তাই সুন্দরী বউ চাই। তার জন্য উপযুক্ততা লাগে। সে আরেক হিসাব। পরিবার লাগে। জেনেশুনে তার জোয়াল নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। সেই জোয়াল আর কাঁধ থেকে নামানোর জো নেই। কেবলই সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে হয়। ফেরার পথ নেই, সেই পথ অনিশ্চিত, বড়ই কঠিন, চড়া মাশুলযুক্ত। তারাপদ রায়ের বিখ্যাত একটা কবিতার কয়েকটি চরণ স্মরণ না করে পারছি না : একটা জন্ম জোড়াতালির, ভাত-কাপড়ের তক্কে তক্কে একটা জীবন মাথা গোঁজার ফন্দি খোঁজে একটা জীবন বাক্স মাথায় ভুল শহরে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে একটা জন্ম এমনি এমনি কেটে গেল একটা জীবন দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। জীবন সায়াহ্নে হিসাব কষতে গিয়ে অনেকেরই হয়তো এরূপ মনে হতে পারে। কেউ অল্পতে তুষ্ট, কেউ বড় বেশি কৃতজ্ঞ। কেউ জীবনের ডেবিট-ক্রেডিটের ব্যালান্স কষতে গিয়ে হতাশ। মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে চলে যেতে হয়, চলে যেতে হবে - এই বোধ আমাদের আত্মস্থ হয়ে আছে ছোটবেলা থেকেই। এই দেহ যখন লাশের উপাধি প্রাপ্ত হয়, তখন তা দেখে সবাই আমরা বলে উঠি, আমরা তো আল্লাহর এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। জীবনের এই অমোঘ সত্যকে মেনে নিয়ে মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াই। তারপরই বেগের তাড়নায়, পেছনে পড়ে থাকার ভয়ে দৌড়াতে থাকি ঊর্ধ্বশ্বাসে। এভাবেই আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে টেনে নিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে। কারও মধ্যে অনুশোচনা হয়, পাথেয়র পরিমাণ কম বলে পরপারের ট্রেনে ওঠায় অজানা ভীতি জাগে। আফসোস দানা বাঁধে। কাফফারা দিয়েও হয়তো তার ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। আমরা এসবের সব জানি, কিন্তু রিপু আমাদের সার্বক্ষণিক সহযাত্রী হয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এদিক-সেদিক, দিগবিদিক। তখন বিবেকের ফ্যাকাল্টি মুমূর্ষু অবস্থায় থাকে। আবেগের পারদ টগবগে ঘোড়ার মতো দিগবিজয়ের নেশায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যেন ফেরার পথ নেই, থামার কোনো নীতি নেই, বিরতি মানেই যেন পিছিয়ে পড়া। সমাজ এগিয়েছে। সমাজচিত্র বদলেছে। সময়ের বরকত কমে যাচ্ছে। তৃপ্তির ব্যারোমিটার উল্লম্ফন যাত্রায় পেরেশান। বিবেক-বিবেচনা বোধ পার্থিব লাভালাভের ওপর নির্ভরশীল। বিবেকের চেয়ে দলের কথা, দলের চেয়ে নেতার কথা শিরোধার্য। নীতির রীতি এখন সিলেবাসের সবচেয়ে কম জায়গাজুড়ে থাকে। স্বার্থের কানাকড়িতে টান পড়লে খুনোখুনি কোনো ব্যাপার না। অমুকের গাড়ি-বাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে দেশে-বিদেশে। তাই আমারও চাই। পড়শীর বিশাল ব্যাংক ব্যালান্স দেশে কিংবা বিদেশে। আমারও থাকা চাই। তার দৌড় সুইস ব্যাংক হলে আমার তো নিদেনপক্ষে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্ডিয়া, ব্যাংককে হওয়া চাই। টাকা কোথা থেকে আসে বা আসবে, তার নির্দিষ্ট কোনো খাত নেই, দৃশ্যমান কোনো সোর্স নেই। অফিসের পিওনের ক্যাশ শত কোটি, মহল্লার হেরোইনখোরের পুঁজি শত শত কোটি টাকা। তাদেরও বাড়ি আছে বিদেশে। তারাও ফি বছর হজ করে, একাধিক উমরাহ করে সপরিবার। টাকা এল কোত্থেকে তার তালাশ কেউ করে না। এমনকি স্ত্রী, পুত্র-কন্যা বা স্বজনরাও না। ভোগের টার্গেট ফিক্সড। তাই সাপ্লাইয়ের চ্যানেল চালু রাখতে সবাই পেরেশান। দান মেরে দান-খয়রাত হচ্ছে প্রচুর। ছওয়াব কামাইয়ের এ হেন খাত নেই, যাতে অবদান নেই। কি শিক্ষিত কি অর্ধশিক্ষিত, দান মারায় কেউই পিছিয়ে নেই। সিন্ডিকেট আছে, ফেডারেশন আছে, সলিড স্ট্রাকচার্ড অলিগার্ক আছে। তাই ভয় নেই। যাদের আছে বুদ্ধি অতিশয়, যারা বুদ্ধিজীবী নামধারী, তাদের আবার আভিজাত্য আছে, নীতিকথাও আছে, আবার ভাগ-বাটোয়ারা জ্ঞানও টনটনে আছে। রাজনীতিবিদদের কথার মাধুর্য অপরিসীম। ‘সুইট টকার’ হিসেবে তারা সমাজে পরম পূজনীয়। তাদের একই অঙ্গে একাধিক রূপ, এক মুখে শত কথা। তারা স্বপ্ন জাগানিয়া। পাবলিক জেনেশুনে বিষ পান করে। আশাহত হয়। দুয়ো ধ্বনি দেয়। আবার কাছে ভেড়ে, অপুষ্ট হাত উঁচিয়ে শ্লোগানে শামিল হয়। না হয়ে উপায় নেই। দলছুট মানেই হারিয়ে যাওয়া, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, আম-ছালা দুটোই হারানো। সকল শ্রেণি-পেশাতেই একই দশা। তাই বলে কি ভালো লোক নেই? আছে। তারা আছে গৃহকোণে, ব্যাকবেঞ্চে, বাইরের পরিত্যক্ত মাঠে, নদীর কিনারায়, সংসারের ঘানি টানতে জোয়াল কাঁধে। সেখানে নিয়ম মেনে সূর্য ওঠে, দিনের পালাবদলে সন্ধ্যা নামে। একটা জীবনে জন্য কত কি যে হচ্ছে, কত শত জারিজুরি যে করতে হচ্ছে তার হিসাব-কিতাব নেই। খেলারামরা খেলে যাচ্ছে। পাবলিক যে যেমন পারছে নিজের মতো করে খাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা কিতাবে লেখা আছে। যার যখন প্রয়োজন, তা থেকে চয়ন করে ভাষণ দিচ্ছে, বয়ান তৈরি করছে। কেউ শুনছে, কেউ মানছে, কেউ হাসছে, কেউ প্রলাপ জ্ঞানে উড়িয়ে দিচ্ছে। আর চামে চামে ঘোড়েল কামেলিয়েরা কাম করে যাচ্ছে। আহা রে জীবন!
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।