কিংসফোর্ড চার্চের সামনে ফিওনেরাল চলাকালে হঠাৎ করেই অপ্রীতিকর একটা ঘটনা ঘটে। খালিল নামের ভদ্রলোকটি শ্যারবেলকে চার্চে ঢুকতে দেখে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসেন এবং তাকে চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি মারতে মারতে একেবারে সিঁড়ির নিচে ফেলে দেন। ফিউনেরালে এ কী ঘটনা! কেউ বুঝে ওঠার আগেই যা ঘটার, তা ঘটে গেছে। এই ভদ্রলোক মারিয়ামের পরিবারের একজন ওয়েল-উইশার ভিন্ন কিছু নন। তবে সময় পরিক্রমায় বিষয়টা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, মারিয়াম যেন এই খালিলের মাঝে স্বামীর ছায়া দেখতে শুরু করেন। তাঁর তিনটি সন্তান সিডনিজীবনের শুরু থেকেই খালিলকে আংকেল বলে ডাকে। মারিয়ামের পরিবারের সব পরামর্শেই খালিলের ডাক পড়ে। সিডনি শহরে মারিয়ামের জীবন শুরু করার মতো কিছুই ছিল না। তিনটি সন্তান নিয়ে এই মা শুধু বেঁচে ছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। তারপর এই দীর্ঘ সময় কোন দিক দিয়ে গেল মারিয়ামের, আজ আর তার হিসাব মেলে না। এতগুলো মৃত্যু বুকে চেপে চিৎকার করে কান্নার সময়টুকুও হয়ে ওঠেনি। ক্রমাগত জীবনযুদ্ধে তাঁর ক্লান্ত হওয়ার সময়ও ছিল না যেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও লেবাননে ফেলে আসা জীবন, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখির মত ডাক দিয়ে তাঁকে আনমনা করে দিত। আল কালিমা সেন্ট অ্যান্থনি ক্যাথলিক পাবলিক স্কুল, দুরন্ত শৈশব, শিক্কায় তাঁদের বাড়ি, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের নীল জল, ছোট-বড় পাহাড়ে সোনালি রোদ, হৃদয়ে স্বর্গ। ১৯৭৬ সালের ৫ জুলাই দানবীয় এক ঘটনা ঘটে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে মা-বাবা, দুই ভাই, স্বামী, দেবর সব শেষ। কে বাঁচল আর কে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তারপর মারিয়াম আর ভাবতে পারেন না। বীভৎস এই স্মৃতি চোখে ভেসে উঠতেই তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। এক অনিশ্চয়তার পথ ধরে সাইপ্রাস হয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি। শ্যারবেলের বয়স সাত বছর, অ্যানতোয়ানের চার আর এই অনাগত ক্রিশ্চিনা...। খালিল মারিয়ামের স্বামী জোসেফের সাথে কর্মসূত্রে পরিচিত। গ্রেটার ওয়েস্টার্ন সিডনির গিল্ডফোর্ডে তাঁর বাড়ির পাশে প্রায় পরিত্যক্ত একটা বাড়িতে আশ্রয় হয়েছিল মারিয়ামের। সিডনিতে ল্যান্ড করার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই মারিয়াম একটা কাবাব শপে চাকরি শুরু করেন। ক্রিশ্চিনার জন্ম হওয়া, তারপর ছয় মাস বয়সী মেয়েকে খালিলের স্ত্রী কারলার কেয়ারে দিয়ে শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। খালিলের পরামর্শে মারিয়াম একদিন নিজেই একটা পজিশন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। চলে যায় দিন মাস বছর। ‘এমন ব্যস্ততা কি আর চিরকাল থাকবে? ছেলে-মেয়েগুলো বড় হয়ে গেলেই দোকানটা ছেড়ে দেব। দেশ দেখতে যাব। ওখানে তো আমার মা-বাবা, ভাই, স্বামী-দেবর সবাই আছে।’ এই ‘আছে’ শব্দটা জড়িয়ে ধরেই যেন বেঁচে থাকা যায়। ‘নাই’ কী যে মর্মান্তিক, কাজ দূরে থাক, শোয়া থেকে মাথাটা তুলে বসার শক্তিটাও থাকে না যেন। অ্যারাবিয়ান শপ। মারিয়ামের জাতার-সালাদের খ্যাতি এলাকাজুড়ে। এই নারীর হাতে একবার এই জাতার-সালাদ যে খেয়েছে, তাকে এখানে আবার আসতে হবে। ভোর পাঁচটা থেকে বেলা এগারোটা পর্যন্ত চলত দোকানটি। ক্রেতার দীর্ঘ লাইন। তারপর একদিন ছোট ক্রিশ্চিনাও হাইস্কুলে চলে গেলে দোকানটি দিনের দ্বিতীয়ার্ধেও বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা আটটা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ব্যবসা বেশ ভালো চলছে। ভাড়া বাসা ছেড়ে চার বেডরুমের একটা বাড়ি কেনেন মারিয়াম। মাসিক ইন্সটলমেন্টের পাশাপাশি বেশ কিছু ইউটিলিটি বিল নিয়মিত পে করা জীবনটাই যেন কেমন এক স্রোতের সাথে মিশে গেল। পেছন ফিরে তাকানোর কোনো উপায় নেই। শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। সন্তানগুলোর মুখে খাবার তুলে দেয়া, তাদের জামাকাপড়, থাকার জায়গা, পড়াশোনার খরচ। তিনটি সন্তান নিয়ে সংগ্রামী এই মা মারিয়াম। এভাবেই ওরা তিনজন বড় হয়, ছেলেরা বিয়ে করে। একদিন ক্রিশ্চিনারও বিয়ে হয়ে গেলে মারিয়াম ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পেনশনে চলে যান। ঘরে-বাইরে ব্যস্ত জীবনের পর হঠাৎ করেই এই একা জীবন, যেন কেমন এক মায়া, পাশাপাশি একটা বোধ মারিয়ামকে ঘিরে ফেলে। ‘মেন্টাল হেল্থ’ এমনই একটা কথা, অপ্রমাণিত হলেও শক্তি অর্জন করল অনেক। দুই ছেলে মাকে নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাল না। প্রাথমিকভাবে মারিয়ামের ঠাঁই হয় ক্রিশ্চিনার বাসায়। গভীর ঘুমে মারিয়াম কথা বলতে থাকেন। কখনো চিৎকার করে ওঠেন। কেউ কাছে গিয়ে মাথায় হাত বোলাতেই শান্ত হন। কখনো নির্বিকার চেয়ে থাকেন। কাউকে চিনতে পারেন না। সন্তানসম্ভবা ক্রিশ্চিনা তার দুই ভাইয়ের সাথে কথা বলল। না, মায়ের বিষয়ে তাদের কারোরই কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। স্মৃতিতে মারিয়ামের শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ি উজ্জ্বল, উজ্জ্বল তার শৈশব-কৈশোর। নর্থ লেবাননের শিক্কায় তাঁদের বাড়িটা আজও আছে। আঙিনার ওই ছোট্ট গাছগুলো তো অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক অগোছালো অনুভূতির ভেতর এক শান্তিময় অনুভূতি ভোরের সূর্যোদয়ের মতো উঁকি দেয়। কত সুন্দর ছিল দিনগুলো—নতুন বিয়ে, নতুন সংসার, স্বামী-দেবর, ভালোবাসা, প্রথম পরশ। একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করে মা হওয়া, কোলজুড়ে এই শ্যারবেল, তারপর অ্যানতোয়ান। অনেক যত্ন-স্নেহ, সন্তানগুলো একদিন বড় হবে। ওখানে ছিল আমার সংসার, ওখানেই সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল। তারপর সেদিন এক আর্তচিৎকারে মারিয়াম বলেছিলেন, ‘আমি কোনো রাজনীতি, জাতি, ধর্ম কিছুই জানি না, আমি জানি আমার জীবন।’ কে ছিল ওরা! কী ছিল তাঁর স্বামীর অপরাধ! ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে মৃত্যুর মিছিলে সন্তানগুলোকে নিয়ে পালানো। লোকে বলে বেঁচে থাকাটাই নাকি এক স্বর্গীয় আশীর্বাদ। মারিয়াম এই আশীর্বাদ বুঝতে পারেন না। এই নির্মম স্মৃতি বুকে চেপে দিনগুলো কেটে গেছে। না, মারিয়ামের মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি নেই। ডাক্তার নিয়মিত অবজারভেশনে রেখেছেন, কিন্তু তেমন কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই। এমন অবস্থায় মারিয়ামের বাড়িটা বিক্রি করে দেয়ার একটা গুঞ্জন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মাকে চার মাস করে নিজ নিজ বাসায় রাখবে, এই শর্তে দুই ভাই আর ক্রিশ্চিনা রাজি হয়। তারপর বাড়িটা বিক্রি করে তিন ভাই-বোন মিলে টাকা ভাগ করে নিয়ে যায়। মারিয়াম বলেন— এই তোরা আমার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছিস? হ মা, তোমার সামনেই তো সব কথা হয়েছে। তুমি সই না দিলে বিক্রি হলো কীভাবে? ও আচ্ছা, আমি সই দিছি, না? কবে দিছি? মা কী বলো এসব! তোরা এক কাজ কর, আমাকে শিক্কায় নিয়ে যা। আমার বাবা, দুই ভাই—গত রাতে স্বপ্নে দেখেছি, তোর বাবা আমাকে নিতে এসেছে। শ্যারবেল বলল— বাবা আসছিল তোমাকে নিতে! চলে গেলে না কেন, মা? তোদের না নিয়ে আমি কোথাও যাব না। শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ান একে অপরের মুখ চেয়ে হাসে। ওদিকে ক্রিশ্চিনা অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তোমার দুই ছেলে লেবাননে যাবে না, মা। আমি তো ওখানে কিছুই চিনি না। তুই চিনবি কী করে, তোর জন্মই তো অস্ট্রেলিয়ায়। একবার গেলেই ঠিক চিনতে পারবি। নিজের বাড়ি চিরকালই আপন। বাড়িটা বিক্রি হওয়ার পর মারিয়াম ক্রিশ্চিনার সাথে আছে। মাকে নিয়ে ভাই-বোনের আলোচনায় ক্রিশ্চিনা স্বাভাবিকভাবে বললেও শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ানের কাছে তা আর স্বাভাবিক রইল না। মাঝে মাঝেই মারিয়াম রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠেন। যুক্তি, অযুক্তি, সুযুক্তি—সব মিলিয়ে ঘটনার শেষ এই দাঁড়াল, এভাবে ঘুমের মধ্যে চিৎকার, এলোমেলো কথা, আউলা আচার-আচরণ, মা কখন কী করে বসেন। সবারই তো জীবন আছে, কাজকর্ম আছে। রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে না পারলে তো যে-কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, তাঁকে সরকারি হাউজিংয়ে রাখা হবে। সার্বিক বিবেচনায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাসাও পাওয়া গেল। মারিয়াম আপত্তি করলেন না। ডেইসিভিলের ইনডেভার রোডে একতলা কাঠের একটা বাড়ি। সামনে বাগান, বিভিন্ন গাছে ঘেরা পরিপাটি আঙিনা। বারান্দা থেকেই বড় রাস্তাটির ওই পারে কিংসফোর্ড চার্চটি দেখা যায়। এখানে এসে মারিয়ামের খুব ভালো লাগল। খুব যত্নে রাখা স্বামীর স্মৃতি—একটা জামা, কবি জিবরান কাহলিলের দুটো বই সুন্দর একটা শোকেসে সাজিয়ে তিনি এখানে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন। ভালোই চলছে। সপ্তাহে একদিন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার থেকে লোক এসে প্রয়োজনীয় শপিং করে দিয়ে যায়। কমিউনিটি সার্ভিসের গাড়ি এসে নিয়ে যাওয়া এবং অ্যারাবিয়ান দু-একজন নারীর সাথে আলাপ-পরিচয়। কখনো পাহাড়ি এলাকা, কখনো সমুদ্র, বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা। জীবনের গল্প। মারিয়ামকে মাসে একবার করে তাঁর ছেলে-মেয়েরা পর্যায়ক্রমে দেখতে আসে। মারিয়াম বলেন— মা, তুই আমার সাথে একদিন থাক। বাবা রে, তুই আরেকটু থাক। তোর কথা আমার খুবই মনে পড়ে। কখনো মারিয়াম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। বাস্তবতার চাপে আড়াল হওয়া স্মৃতিগুলো বের হয়ে আসতে শুরু হয়। চোখের সামনে শিশুর মতো খেলা করে ফেলে আসা হৃদয়। মারিয়ামের ছোট বাড়িটা মনের মতো করে সাজিয়েছেন। বাসার সামনের আঙিনায় নানা রকম ফুলের গাছ। সম্প্রতি তিনি ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি গাছ রোপণ করেছেন। গাছগুলো বারান্দার খুব কাছে। এখানে বসে তিনি গাছের সাথে কথা বলেন। বড় গাছটা জোসেফ, জোসেফের পাশে ছোট গাছটাকে তিনি কোনো নাম ধরে ডাকেন না। এই টবে পানি দিতে গিয়ে তিনি থেমে যান। নামহীনা গাছটার সাথে তাঁর কথা থেমে যায়। পাশে শ্যারবেল, তারপর অ্যানতোয়ানের পাশে ক্রিশ্চিনা। অনেক কথার মাঝে শুধু নামহীন গাছটার দিকে নির্বাক চেয়ে থাকেন এই কথাহীনা। ঠিক এমনই একদিন মারিয়ামকে দেখতে এসে খালিল দেখেন, মারিয়াম আর এই বাড়িতে নেই। বাড়িটা লক করা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই নারী ডিমেনসিয়ায় ভুগছেন, তাই মারিয়ামের বড় ছেলে তাঁকে এইজ কেয়ারে নিয়ে গেছে। খালিলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আরে এ কী! মাকে নিয়ে এসব কী শুরু করল ওরা? খালিল ঠিকানা সংগ্রহ করে তাঁকে দেখতে যান। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মারিয়ামের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ। মারিয়াম, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি। প্রায় মিনিটখানেক কোনো কথাই বলেননি তিনি। হঠাৎ করে কেঁদে বলেন— জোসেফকে অনেক মিস করছি, কত মনে পড়ে! তার স্মৃতিগুলো দিয়ে কত সুন্দর করে বাসাটা সাজিয়েছিলাম! প্রতি মুহূর্তে তাকে অনুভব করতাম। ওরা আমার এত কষ্টে কেনা বাড়িটা বিক্রি করে দিল। আচ্ছা যা হোক, বাড়ি বিক্রির টাকা তো আমার ছেলে-মেয়েই নিয়েছে। কিছু মনে করিনি। সরকারি বাসাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমাকে তো ওখানেও থাকতে দিল না। এত এত মিথ্যা কথা বলে আমাকে এনে এখানে রেখে গেছে। আমি তো ডেইসিভিলের সরকারি বাড়িতে অনেক ভালো ছিলাম। এই এইজ কেয়ারে তো আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি কেন এখানে! খালিল শ্যারবেলের সাথে যোগাযোগ করেন। একে একে মারিয়ামের তিন ছেলে-মেয়ের সাথেই কথা বলেন। সবারই ওই একই কথা। ‘মায়ের ডিমেনসিয়া বর্ডার লাইন ক্রস করে গেছে। এখন তাঁর সার্বক্ষণিক সুপারভিসন দরকার। নইলে কখন যে আবার বড় রাস্তায় গিয়ে গাড়িচাপা পড়ে! সার্বক্ষণিক দেখভাল কে করবে?’ এমন আরও অনেক কথা। ডিমেনসিয়া! কী করে বুঝলে? আচরণে বুঝেছি। কী এমন আচরণ? এই তো বাবার জন্য কাঁদে, বাসার সামনে গাছ লাগিয়ে ছেলে-মেয়ে বলে ভাবে। নিজে নিজে কথা বলে। তোমরা দুই ভাই নিজের বাসায় না পারো তোমাদের আশপাশে কোথাও মায়ের থাকার ব্যবস্থা করতে পারতে। এটাই তো সমস্যা, ক্রিশ্চিনা দুই সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে আমার ওয়াইফ সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, চাকরি, বাসা সামলানো—সব সামাল দিয়ে মাকে দেখতে যে যাব, সময় করতে পারি না। ওখানে ডেইসিভিলের বাসা থেকে গার্ডেনার্স রোডের অপোজিটেই কিংসফোর্ড চার্চ। ফিউনেরাল ম্যাস তো প্রায়ই হয়। কফিনবাহী কালো গাড়ি এসে চার্চের সামনে থামতে দেখলেই শুরু করে বিলাপ। প্যাডিস্ট্রিয়ান ক্রসিং না মেনেই এত বড় ব্যস্ত রাস্তাটা পার হয়ে কফিনবাহী গাড়ি জড়িয়ে ধরে কাঁদে, কখনো-বা চার্চে ঢুকে কফিন জড়িয়ে ধরে শুরু করে আহাজারি। ফিউনেরাল করতে চার্চে আনে, কোথাকার কোন মরা, মা কাঁদবে কেন? কী একটা বিপদ! ওখানে থাকে একা, যদি গাড়িচাপা পড়ে! তখন তো হবে আরেক কেলেঙ্কারি। নিরাপত্তার কথা ভেবে ওল্ড হোমে দেয়া। লেবাননের ওই গৃহযুদ্ধে যখন তোমাদের বাবা, কাকা, মামা সবাই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, তখন থেকে তোমাদের মা এত বড় শোক বুকে চাপা দিয়ে তিনটা সন্তানকে কোলেপিঠে আগলে রেখেছে। মারিয়াম কি তোমাদের কখনো এতিমখানায় পাঠানোর কথা ভুলেও ভেবেছে? মারিয়ামের ছেলে-মেয়ে তিনজনই নীরব। সবাই মাথা নিচু করে বসে আছে। মারিয়ামের এত কষ্টের বাড়িটা তোমরা বিক্রি করে দিলে? তোমাদের শৈশবের স্মৃতি, বেড়ে ওঠা, মায়ের স্ট্রাগল—হৃদয়ে একটুও দাগ কাটল না! খালিল কিছুটা গরম স্বরে বললেন— কাট দ্য ক্রাপ্ট। খুব ভালো করে বুঝতে পারছি, তোমাদের সাথে এমন কথার খই ভেজে কিচ্ছু হবে না। ওই কঠিন দিনের অভিজ্ঞতা তোমাদের নেই। কফিন জড়িয়ে ধরে মারিয়াম কেন কাঁদে, তোমরা তা বুঝবে না। তোমরা বলবে, কোথাকার কোন মরা। খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব মৃত্যুর মাঝেই মৃত্যুরা মিশে আছে। কী করে বুঝবে? শুধু এটুকু মনে রেখো, আমি তোমার বাবা জোসেফের বন্ধু। মারিয়াম আমার ওই বন্ধুর স্ত্রী। তোমাদের নিজ সন্তানের চেয়ে কোনো অংশে কম দেখিনি। শুধু এটুকু দাবিতে ওল্ড হোমে সপ্তাহে একবার মারিয়ামকে আমি দেখতে যাব। এখন থেকে সে আমার আপন বোন। ঠিক তাই। খালিল প্রায় প্রতি সপ্তাহে ওল্ড হোমে মারিয়ামকে দেখতে যান। মাস দুই পরপর তাঁর নিজের গাড়িতে করে এনে মারিয়ামের ডেইসিভিলের বাড়িটা দেখান। এ বাড়িতে এখন একজন গ্রিক নারী থাকেন। নাম এলিজাবেথ। খালিল তাঁকে এলিজা বলে ডাকেন। আধভাঙা ইংলিশ, আন্তরিকতায় ভাষা যেন কোনো অন্তরায় নয়। মারিয়ামের গড়া বাগানটির যত্ন নেন তিনি। জোসেফের স্মৃতিগুলো আজও এ বাড়িতেই আছে। এলিজাবেথ খুব যত্ন করে রাখেন। মারিয়াম যখন বাগানে এসে বসেন, এলিজাবেথ তখন জোসেফের স্মৃতিগুলো মারিয়ামের সামনে এনে রাখেন। কল্পনায় সাজানো শিক্কায় ওই স্বপ্নের সংসারটা দেখেন মারিয়াম। স্মৃতির সাথে কথা বলেন। তাঁর জাতার শপ—ওখানে এখন একটা কফিশপ চালু হয়েছে। তিন সন্তান মিলে বিক্রি করে দেয়া বাড়িটাতে খালিল ইচ্ছে করেই আর যেতে চান না হয়তো। মারিয়ামকে নিয়ে খালিলের গাড়িটা আবার ওল্ড হোমের দিকে ফিরে যায়। এভাবেই খালিলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকা মারিয়াম যেন একটা অন্য রকম জগত খুঁজে পান। বছর ঘুরে নতুন বছরও প্রায় শেষ। ক্রিসমাস ছুটির কোনো এক দিনে একটা ঘটনা ঘটে। সেদিন ক্রিশ্চিনা মাকে দেখতে এলে মারিয়াম মেয়েকে চিনতে পারেন না। না, একেবারেই না। একে একে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান দুজনই মাকে দেখতে এল। মারিয়াম তিন সন্তানকেই আর চিনতে পারলেন না। খালিলের সাথে যোগাযোগ করা হলো। খালিল বললেন, ‘আরে এ আবার কোন ঘটনা! মা আবার সন্তান চিনে না কেমনে! আচ্ছা শোনো, এই শনিবার সকাল দশটায় তোমরা মায়ের কাছে আসবে, আমি থাকব।’ শনিবার খালিল সকাল নয়টার দিকেই চলে আসেন। মারিয়ামের আচরণে কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা না দেখে তিনি বিষয়টাকে সহজভাবেই নিয়েছিলেন। খালিলের সামনে মারিয়াম হয়তো এমনটা আর করবেন না। ওরা তিনজন যথাসময়ে চলে এলে দেখা গেল, ঘটনা আরও ভয়াবহ। না, মারিয়ামের তিনটা সন্তান যেন অচেনারও অচেনা। ক্রিশ্চিনা মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। খালিল ক্রিশ্চিনাকে আশ্বস্ত করেন— এই মেয়ে চুপ থাকো। মারিয়ামের সাথে আমি কথা বলব। ঘটনাটা আসলে কী, তা আমাকে বুঝতে দাও। ঠিক তখনই মারিয়ামের ছোট ছেলে অ্যানতোয়ান খালিলের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল— তুমি তো বিশ্বাসই করতে চাও না, মায়ের ডিমেনসিয়া স্বাভাবিক পর্যায় পার হয়ে পুরোপুরি মানসিক রোগী হয়ে গেছে। নিজের সন্তান চেনে না! বুঝলে তো এখন? শ্যারবেল তার ছোট ভাইয়ের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল। এ দুই ছেলের মধ্যে মায়ের এই আচরণের প্রতিক্রিয়ায় তারা এটা প্রমাণ করে খুবই আনন্দিত যে, তাদের মা মানসিক রোগী। লোকসমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার মতো মেন্টাল ফিটনেস তাঁর নেই। এ নারী কোনো পরিবারের সাথে থাকা তো আরও বিপজ্জনক। তাই মারিয়ামের জন্য ডাক্তার, নার্স আর নিরাপত্তাকর্মীদের সুপারভিসনে এই ওল্ড হোমে থাকাটাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। খালিল চুপচাপ বসে শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ানের কথার ইঙ্গিত লক্ষ করেন। এদিকে ক্রিশ্চিনা মায়ের হাত ধরে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। মা সন্তানকে চিনতে পারছেন না, এর দায় মেন্টাল ইলনেসের। এখানে সন্তানদের কিছুই করার নেই। আ হা হা, বিশ্ব সংসার তখন খালিলের দিকে তাকিয়ে ইয়ার্কি করে। তাঁর শ্রবণে কী সব এলোমেলো শব্দ ভেসে আসে। কোথায় কোন গহিনে পথহারা শিশু যেন কাঁদে, মাকে খোঁজে। ঠিক তখনই তাঁর ইচ্ছে হয়, ইশ্, এখন যদি কোনো একটা উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কিছুক্ষণ কাঁদতে পারতাম, মনে হয় ভালো লাগত।’ এই শোনো, মারিয়াম তোমাদের মা। তোমাদের আচরণে কষ্ট পেয়ে না চেনার ভান করছেন, তা বোঝার মতো শক্তিটা পর্যন্ত হারিয়েছ তোমরা। অনুতপ্ত হয়ে মায়ের কাছে ক্ষমা না চেয়ে বরং উল্টা মাকে সাইকোপ্যাথ ভেবে খুশি মনে চলে যাচ্ছ—কথাগুলো বলতে গিয়েও খালিল নিজেকে সংযতই রাখলেন। এ সময় মারিয়ামের চোখের দিকে তাকান খালিল। মারিয়ামও খালিলের দিকে একঝলক তাকিয়ে জানালা দিয়ে নিরুদ্দেশ আকাশের পানে চেয়ে রইলেন। এই দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্কায় ঘটে যাওয়া ওই নির্মমতা যেন আবার এ দুজনের বুক কাঁপিয়ে গেল। মারিয়াম একদিন বলেছিলেন, ‘খালিল, তুমি আর আমি একদিন শিক্কায় যাব। ভূমধ্যসাগরে ঢেউয়ে ঝলমল করা রুপালি জোছনা দেখব। পাহাড়ের গায়ে শুয়ে থাকা রোদ দেখব। আমার স্বামীর ভিটায় থাকব। আঙিনায় গাছ থাকবে, গাছের নাম হবে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান ও ক্রিশ্চিনা। আর বড় গাছটা, ওটা জোসেফ। বড় গাছটার পাশেই যে গাছটা থাকবে, ওটা কে জানো...’ মারিয়ামের মুখে হাসি। খালিল মারিয়ামের মুখ চেয়ে হাসেন। তারপর বিকেলবেলায় ছাদে বসে সাগরের দিকে চেয়ে থাকব, চা খাব। তুমি জানো খালিল, জোসেফ ভালো চা বানাতে পারে। আমাদের দেখে নীল সাগর কথা বলে উঠবে। আমাদের বাড়িটা একটু জীর্ণ হয়ে গেলেও আজও আছে। খালিল, তুমি অনেক ভালো মানুষ, আমাকে একদিন শিক্কায় নিয়ে যাবে? খালিল করুণ দৃষ্টিতে মারিয়ামের দিকে চেয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। দেশে যেতেই হবে, নইলে বাঁচব না তো।’ ক্রিশ্চিনা মারিয়ামের কাছে বসে আছে। শ্যারবেল আর অ্যানতোয়ান খালিলের দিকে উপহাস অথবা বিদ্রূপ এমনই একটা দৃষ্টি দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে খালিল এবার শিকারির গুলিতে আহত হরিণের মতো লাফিয়ে ওঠেন। আরবি-ইংলিশের মিশ্রণে কী সব লেবানিজ অশ্রাব্য গালাগালি শেষে মারিয়ামের মাথাটা বুকের কাছে টেনে বলেন— এ রে শ্যারবেল, অ্যানতোয়ান, ভালো করে জেনে রাখিস, মারিয়ামকে আমার আপন বোন করে নিয়েছি। ভাবার কোনো কারণ নেই যে সে একা। তোদের যেন মারিয়ামের ফিউনেরালেও না দেখি। হাত নেড়ে চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেয়ার ভঙ্গিতে খালিল আরও বললেন— কথাটা মনে রাখিস। মারিয়াম ডেইসিভিলের বাড়িতে যতদিন ছিলেন, ততদিন কিংসফোর্ড চার্চে ছিল তাঁর নিয়মিত আসা-যাওয়া। সেখানে কমবেশি সকলেই মারিয়ামকে চিনতেন। যেকোনো ফিউনেরাল, চার্চের সামনে কফিনবাহী কালো গাড়িটা দেখামাত্রই মারিয়াম দৌড়ে গিয়ে ফিউনেরালে যোগ দিতেন। কোথাকার কে মারা গেল, কার কফিন—এসব তাঁর মধ্যে কাজ করত না। অচেনা-অজানা মরে যাওয়া মানুষটার মায়ায় কেঁদে বুক ভাসাতেন তিনি। মারিয়ামের কান্না দেখে ফিউনেরালে অশ্রুজলে শোকের ছায়া নেমে আসত। ওই দৃশ্য আজও অনেকের চোখে ভাসে। আজ এই মারিয়ামের ফিউনেরাল ম্যাসে গুটিকয়েক লোকের মাঝে ক্রিশ্চিনার চোখের জলই সবাই দেখেছে। আরেকটা মানুষ, যাঁর চোখের জল পাথরচাপা পড়ে আছে, তিনি এই খালিল। আজ তাঁর এই রুদ্রমূর্তি—শ্যারবেলকে কিল-ঘুষি মেরে চার্চের সিঁড়িতে ফেলে দিয়েছেন। বিষয়টি দূর থেকে দেখে অ্যানতোয়ান এক দৌড়ে কোথায় পালিয়ে গেল, মায়ের ফিউনেরালে তার আর পাত্তা পাওয়া গেল না।
ভোরের প্রথম ট্রেনটা যখন হুইসেল বাজিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে যায়, তখনো শহরের অর্ধেক মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু একজন মানুষ অনেক আগেই জেগে ওঠেন। হাতে বাঁশের ঝাঁটা, পাশে পুরোনো একটা বালতি, চোখে ক্লান্তি আর মুখে কোনো শব্দ নেই। শব্দহীন মানুষটির নাম ছিল বুবি। তিনি বোবা ছিলেন। তাই কারও সঙ্গে তর্ক করতেন না, অভিযোগও করতেন না। শুধু ভাঙা ভাঙা হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন, তিনি আছেন, কাজ করছেন, বেঁচে আছেন। স্টেশনটাই যেন ছিল তাঁর সংসার। প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা চায়ের কাপ, বিস্কুটের মোড়ক, কাদামাখা বাথরুম, সবকিছুর সঙ্গে তাঁর এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। যেন এই নোংরাগুলো পরিষ্কার করলেই পৃথিবীটা একটু সুন্দর হবে। লোকজন তাঁকে চিনত। কেউ কেউ পুরোনো কাপড় দিত, কেউ দুপুরের ভাত। আবার অনেকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত, যেন তিনি কোনো মানুষ নন, সামান্য কোনো অস্তিত্ব মাত্র। কেউ জানত না, বুবিরও একটা পরিবার ছিল। অনেক বছর আগে অভাব, ভুল-বোঝাবুঝি আর ভাগ্যের নির্মম আঘাতে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। প্রথম দিকে হয়তো অপেক্ষা করেছিলেন, কেউ এসে বলবে, চলো, বাড়ি ফিরি। তারপর একদিন সেই অপেক্ষাও শেষ হয়ে যায়। মানুষ যখন দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে, তখন অপেক্ষাটাও একসময় মরে যায়। তবু তিনি বাঁচতেন। একটা ছোট্ট টিনের বাক্সে প্রতিদিন কয়েকটা করে টাকা জমাতেন। পাঁচ টাকা, দশ টাকা, কখনো পঞ্চাশ টাকা। বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে হয়েছিল চল্লিশ হাজার টাকা। কেউ জিজ্ঞেস করলে ইশারায় বুঝিয়ে দিতেন, একটা ছোট ঘর করবেন। বর্ষার রাতে যাতে ছাদ দিয়ে পানি না পড়ে। আর একটা খাট কিনবেন, যেখানে শুয়ে এক রাত নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। তার স্বপ্নগুলো খুব বড় ছিল না। কিন্তু পৃথিবী সব সময় বড় স্বপ্নই ভাঙে না, কখনো কখনো সবচেয়ে ছোট স্বপ্নটাও নির্মমভাবে চূর্ণ করে দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল। বুবি তাঁর টিনের বাক্সটা নিয়ে ফিরছিলেন বস্তির দিকে। অন্ধকার গলিতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর পথ আটকে দাঁড়াল। তারা টাকা চাইল। বুবি কথা বলতে পারতেন না। দুই হাতে বাক্সটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল বহু বছরের কষ্টে জমানো স্বপ্ন হারানোর আতঙ্ক। পরক্ষণেই শুরু হলো নির্মম মারধর। বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছিল। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা মানুষটার রক্ত আর বৃষ্টির পানি একসঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। দুর্বৃত্তরা টিনের বাক্সটা নিয়ে চলে গেল। ভেতরে ছিল চল্লিশ হাজার টাকা। আর বাক্সটার সঙ্গে তারা নিয়ে গেল এক বোবা মানুষের পঁচিশ বছরের আশা। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব শেষ। ময়নাতদন্তের পর হাসপাতালের লোকজন অপেক্ষা করল, হয়তো পরিবারের কেউ আসবে। কেউ এল না। যাদের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক ছিল, তাদের কাছে তিনি অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিলেন। অবশেষে কয়েকজন অপরিচিত মানুষ তাঁকে কবর দিল। জানাজায় ভিড় ছিল না। কবরের পাশে কান্নার মানুষও ছিল না। শুধু আকাশ কাঁদছিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটার পর একটা মাটির ওপর পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন সেই মানুষটার জন্য দোয়া করছে, যিনি সারা জীবন মানুষের ফেলে যাওয়া নোংরা পরিষ্কার করেছেন, অথচ মানুষের মন থেকে নিজের জন্য একটুখানি জায়গাও পরিষ্কার করতে পারেননি। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ রেলকর্মী আস্তে করে একটা কদমগাছের চারা মাটিতে পুঁতে দিলেন। কেউ তাঁকে বলেনি। কেউ দেখেওনি। তিনি শুধু বললেন, গাছটা বড় হলে অন্তত ছায়া দেবে। মানুষটার জীবনে তো ছায়া ছিল না। বছর কেটে যাবে। স্টেশনে নতুন ঝাড়ুদার আসবে। নতুন ট্রেন আসবে। নতুন যাত্রীদের ভিড় হবে। কদমগাছটা হয়তো একদিন বড় হবে। তার ফুল ঝরে পড়বে সেই কবরের ওপর। হয়তো কেউ জানবেও না, নিচে ঘুমিয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি সারা জীবন অন্যের পথ পরিষ্কার করেছেন, কিন্তু নিজের জীবনের পথটা কোনো দিন আলোয় ভরাতে পারেননি। মানুষের মৃত্যু একদিন হয়। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে বড় মৃত্যু ঘটে সেদিন, যেদিন একজন অসহায় মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর মৃত্যুকে আমরা এতটাই সাধারণ মনে করি যে, তাকে মনে রাখার প্রয়োজনও অনুভব করি না।
আমাদের গ্রামে এখন আর ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি শোনা যায় না। তবু শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, কেউ যেন অদৃশ্য হাতে একটি পুরোনো চিঠি এসে রেখে গেছে উঠোনে, যে চিঠি কোনো দিন লেখা হয়নি, তবু যার প্রতিটি শব্দ আমি মুখস্থ জানি। বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত। দাদি তখন জানালার পাশে বসে দূরে তাকিয়ে নরম গলায় বলতেন, “আজ তোর দাদাজানের কথা খুব মনে পড়ছে।” তারপর গল্প খুলে বসতেন। এমনই এক বর্ষার বিকেলে দাদাজান নাকি প্রথম এসেছিলেন। ভিজে কাপড় থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, হাতে এক তোড়া কদম ফুল। দাদি লজ্জায় আঁচল টেনে মুখ ঢেকেছিলেন, কিন্তু চোখের কোণে ফুটে উঠেছিল এক নিঃশব্দ হাসি। সেই হাসির কথা বলতে বলতে দাদির মুখেও যেন আবার যৌবনের আলো ফিরে আসত। আমাদের মেঠোপথ তখন কাদায় থকথকে। স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে কতবার যে পিছলে পড়েছি! বই-খাতা ভিজে নরম হয়ে যেত, জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি। তবু সে ছিল অদ্ভুত আনন্দের সময়। আমরা বন্ধুরা কাগজের নৌকা বানিয়ে রাস্তার ধারের জমে থাকা পানিতে ভাসাতাম। কার নৌকা সবার আগে বাঁক পেরোবে, কারটা সবচেয়ে দূরে যাবে — এসব নিয়েই কত হাসি, কত হইচই! হাওরপাড়ের সেই গ্রামে বর্ষা ছিল যেন আরেকটি পৃথিবী। পানি বাড়তে বাড়তে উঠোন ছুঁয়ে ফেলত। দূরের তালগাছগুলোকে মনে হতো, তারা যেন জলের বুক থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। গভীর রাতে শুয়ে শুনতাম ঢেউয়ের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। মনে হতো, পুরো গ্রাম যেন জলের বুকে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে অচেনা কোনো স্বপ্নের দিকে। সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। দাদি নেই, দাদাজানও নেই। সেই কদমগাছটি আর আগের মতো ফুলে ভরে ওঠে না। মেঠোপথের জায়গায় পাকা রাস্তা এসেছে, আর কাগজের নৌকার জায়গা দখল করেছে মুঠোফোনের নীল আলো। তবু প্রথম বর্ষার বৃষ্টি নামলেই বুকের ভেতর কোথায় যেন একটি ভেজা খাম খুলে যায়। মনে হয় ভালোবাসা, অপেক্ষা আর ফেলে আসা শৈশবের নামে লেখা এক অলিখিত চিঠি আজও পৌঁছাতে দেরি করেনি। তাই আমার কাছে বর্ষা কেবল একটি ঋতুর নাম নয়। বর্ষা এক নীরব ডাকপিয়ন, যে প্রতিবছর ভিজে হাতে ফিরে আসে, স্মৃতির পুরোনো খামগুলো নিঃশব্দে খুলে দেয়, আর হৃদয়কে আবার পড়িয়ে যায় সেই সব চিঠি, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, অথচ কোনো দিন হারিয়েও যায়নি।
আকাশে রঙিন ভোরের আভা মেখে যখন গ্রাম জেগে ওঠে, তখনই মেঠোপথে দেখা মেলে বাউল` জয়নালের। কাঁধে ঝোলা, হাতে একতারা, চোখে যেন অন্য দুনিয়ার আলো। তার হাঁটা যেন গানের তালে বাঁধা, তার নিশ্বাসে লুকিয়ে থাকে শত শোক-সুখের সুর। সে গাইতে থাকে লালন ফকিরের বিখ্যাত গান- মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।। গান ধরলেই মনে হয়, বাতাসও যেন থমকে শোনে। লোকজন জয়নালকে ডাকে ‘ছন্নছাড়া’, কেউ বলে ‘পাগল’, কিন্তু তার গান শোনার পর বোঝা যায়—সে একজন বিরহের প্রেমিক, আবার মুক্তিরও ফেরিওয়ালা। জয়নালের জীবনটা এমন ছিল না। একসময় তারও ছিল সংসার, ছিল প্রিয়তমা আসমা জান। আসমা জানের চোখে ভরপুর ছিল স্বপ্ন। ছিল ধানের একচিলতে উঠোন। সন্ধ্যায় আসমার হাতের রান্নার সুস্বাদু ম-ম ঘ্রাণে ঘর ভরে যেত। কিন্তু জয়নালের বুকে হঠাৎই জন্ম নিল অদ্ভুত তৃষ্ণা। গানের সুরে মানুষের মন খোঁজা, আত্মার দর্শন মিলা। সংসারের চার দেয়ালে বন্দী তার ভালো লাগল না। এমনকি আসমার ভালোবাসার আঁচলও তাকে বেঁধে রাখতে পারল না। এক রাতে বৃষ্টি ঝরছিল। আসমা জান নাইওর এসেছিল বাপের বাড়ি। সাথে স্বমী জয়নালও। গভীর রাত। বাইরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। আসমা জান ঘুমিয়ে ছিল। আর জয়নাল নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল দোতারা হাতে। ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “হে অদৃশ্য সৃষ্টির মালিক, আমি কি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব?” বাতাসে যেন প্রতিধ্বনি ভেসে এলো, “পথে নামলেই পথ খুলে যায়।” দিন যায়, বছর যায়। জয়নালের গান ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে, গঞ্জের হাটে, মেলার মাঠে আর লঞ্চ-স্টিমারে। তার সুরে প্রেম আর বিরহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একবার মেলার আখড়ায় গাইছিল সে। ভিড়ের মাঝে এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করল, “বাউল ভাই, এত ঘুরে বেড়ান কেন? ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষকে ভালোবাসা যায় না? সংসার করতে ইচ্ছে হয় না৷ নাকি সংসার নাই? ঘোলে কি আর দুধের স্বাদ মিটে? গান বাজনা মনের খোরাক। আর সংসার হলো বেঁচে থাকার খুঁটি। সেই খুঁটি ভেঙে গেলে জীবন পানসে হয়ে যায়। তরুণের তাত্ত্বিক কথা শুনে জয়নাল হাসে। মনের কোণে একটা ব্যথা চিন চিন করতে থাকে। বছর পাঁচ হয় স্ত্রী আসমা জানকে ঘুমে রেখে ঘর ছেড়েছে। এর মাঝে আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। জয়নাল দোতারা বাজিয়ে বলল, “ভাই, সংসারের বাঁধন ভালোবাসাকে শেকল দেয়। আর পথের ধুলোয় মানুষকে পেলে, তার চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, সব প্রেম আসলে একই প্রেম। ঘরের প্রেমও, দুনিয়ার প্রেমও, ঈশ্বরের প্রেমও। তরুণ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ হয়ে গেল। জয়নালের অন্তরে এক গভীর শূন্যতা ছায়া ফেলে। রাতে নদীর পাড়ে বসে সে আকাশ দেখে। চোখের পর্দায় আসমা জানের মুখ ভেসে উঠে। সে ফিসফিস করে বলে, ‘আসমা জান, আমি তোমায় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু গানে গানে আমি তোমারই প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরি।’ এক বৃদ্ধ সাধক, যিনি পাশেই ধ্যানে বসেছিলেন, চোখ মেলে বললেন, “বাবা, প্রেম আর বিরহকে আলাদা ভেবো না। প্রেমের ভেতরেই বিরহ লুকানো, বিরহের ভেতরেই প্রেম। দোতারায় যখন টান দাও, দুটি তারে ভিন্ন সুর বাজে, কিন্তু শেষে মিলেমিশে এক হয়। জীবনও তাই। তবে দোতারার একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন সুর ওঠে না, সংসারজীবনও ঠিক তাই। মন ভেঙে গেলে কাচ ভাঙার মতো আর জোড়া লাগে না। বৃদ্ধ সাধকের কথায় বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথাটা একটু বেড়ে গেল। জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নোয়াল। জীবনের অংঙ্ক বড়ই জটিল। পরদিন সে ফিরল নিজের গ্রামে। কাশফুলে ভরে গেছে মাঠ, আকাশনীলে সাদাকালো মেঘের মেলা বসেছে। জয়নাল এসে দাঁড়াল শ্বশুরবাড়ির পুরোনো উঠোনে। দরজায় নক করতেই আসমা জান বেরিয়ে এল। জয়নালের চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। কী বলে নিজের দোষ ভাঙাবে ঠিক করতে পারে না। জয়নালকে দেখে আসমা জানও অবাক। পাঁচ বছর যার কোনো খোঁজ ছিল না, সে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? জয়নাল মাথা নিচু করে জানতে চায়, “আসমা জান, কেমন আছ? আসমা বলল, “আপনি কি আপনার মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছেন?” জয়নালের বুক কেঁপে উঠল। জয়নাল এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার গান, তার প্রেম, তার ভ্রমণ - সবকিছু ছিল মনের ঘোর। তরুণ আর বৃদ্ধ সাধকের তাত্ত্বিক কথায় জয়নালের বাউলজীবনের ঘোর কাটলেও আসমা জানের প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। সে পথে পথে ঘুরেফিরে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক গান গেয়েছে। কিন্তু স্ত্রী আসমা জানের মতো দরদি মানুষ পায়নি। একটা অচেনা কষ্টে চোখ ভিজে আসে। দোতারা বুকে চেপে ধরে সে গেয়ে ওঠে, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’ “আসমা জান, সত্যি বলতে তোমার মতো কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি যে আমার অন্তরে গানের সুরে মিশে আছ।” জয়নালের কথা শুনে আসমা জান একটুখানি হেসে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। তার পরও চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আসমা জান কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “তোমার আসমা জান আর তোমার নেই। সে এখন দূর আকাশের চাঁদ-তারা।” জয়নাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসে, “বাহিরে কে এল?” আসমা জান কোনো জবাব না দিয়ে ঘরের দরজা বিকট শব্দে এঁটে দেয়। গলার স্বরটা জয়নালের চেনা চেনা লাগে। অনেকটা তার ওস্তাদজির কণ্ঠ। ওস্তাদ গানের তালিম দিতে গিয়ে আসমা জানের ঠিকানা নিয়েছিল। বলেছিল, যদি ওদিকে যায় তাহলে দেখা করবে। তাহলে কি ওস্তাদজি আসমা জানকে বিয়ে করেছে? কিছুই ভাবতে পারে না। সবকিছু এলোমেলো লাগে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে জয়নাল বুঝে যায়, তার জীবনটা তারছেঁড়া বেসুরা এক দোতারা। অন্তহীন গান, যার দুঃখের শেষ নেই। জয়নালের চোখে কালো মেঘের বিজলি চমকাতে থাকে। বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তে সে বুঝে যায়, ওস্তাদই তার আসমা জানকে দখল করেছে। এখন পথই তার ঘর, খোলা আকাশই তার মাথার ছাদ, আর গানই তার মুক্তি। আসমা জানের চোখে যে অশ্রুর ঝিলিক দেখেছিল, তা তার শেষ আশীর্বাদ, আবার শেষ বিদায়ও। দোতারা বুকে জড়িয়ে সে হাঁটতে থাকে মেঠোপথ ধরে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে, যেন প্রতিটি ফুল তার ছিন্ন জীবনের সাদা অশ্রুবিন্দু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জয়নালের কণ্ঠ- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।’ গানের সুর ভেসে ওঠে দূরের নদীতে, কাশবনে, হয়তো আসমা জানের জানালার কাচেও ঠেকে যায় জয়নালের সুর। আসমা জান হয়তো শুনবে, হয়তো শুনবে না। কিন্তু সেই সুরে তার ভালোবাসা আর অভিমান মিলেমিশে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আর জয়নাল? সে চলে যায় অদৃশ্য পথের দিকে, এক ছিন্ন দোতারার সুরে, যা থামবে না কোনো দিন, যেমন থামে না প্রেমের অশ্রু, যেমন থামে না বিরহের গান। হয়তো আসমা জানের বুকেও একদিন প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজবে জয়নালের গান।
রিমা বিছানা ছেড়ে আড়মোড়া দিয়ে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল, বিকেল চারটে বেজে গেছে। জানালার কাছে গিয়ে দেখল, আকাশটা একদম পরিষ্কার। আনমনে রিমা বলল, যাহ, একটুও বৃষ্টি নেই! রিমা ঝটপট সাজগোজ করে বাসার নিচে এল। একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠেই বলল, “এই মামা, বৃক্ষমেলায় চলো।” বরাবরই তার বৃক্ষমেলায় ঘুরতে ভীষণ ভালো লাগে। বৃক্ষমেলার কাছেই তার বাসা। রিমা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার এক পরিচিত আত্মীয়র বাসায় ভাড়া থাকে। রিমার গাছ কিনতে খুব ভালো লাগে। সে বিভিন্ন ফুল-ফুলের গাছ গাছ কিনে তার বাড়িতে পাঠায়। এ জন্য তার বাবা খুব খুশি হন। এবারও অনেক চারা কিনল সে। নিজে নিজে কিছু সেলফিও তুলছিল। হঠাৎ পেছনে দেখে রোহান দাঁড়িয়ে আছে। সেলফিতে একসঙ্গে ক্যামেরায় বন্দী হলো দুজনই। রিমা শুধু পেছনে একবার রোহানের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলল। রোহান রিমার হাতটা টেনে ধরে বলল- কী ব্যাপার, কিছু না বলে চলে যাচ্ছ যে! এখনো রেগে আছ? আমি সরি বলছি তো! অভিমানে রিমা আরও দ্রুত হেঁটে যেতে লাগল। রোহান তখন বলল- প্লিজ রিমা, কী এমন বলেছিলাম সেদিন, তাতে এত রাগ! দুই থেকে তিন মাস তুমি আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখছ না। এসো রিমা, আমরা দুজন একটা চা-স্টলে বসে কিছু খাই আর কথা বলি। কী কথা বলবে? সেই কথা যে আমি রাত জাগি, রাত জেগে কত গল্প করি!এগুলো বলবে তো? দরকার নেই, তুমি তোমার মতো থাকো, আমি আমার মতো। সামান্য এ কথাতেই তুমি ভুল বুঝেছ? আমি শুধু তোমার বান্ধবী রিতুকে বলেছি যে ঋতু, রিমা যেন রাত না জাগে। ওর শরীর খারাপ করবে, এইটুকু শুধু বলেছি। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখন বাসায় ফিরব। আমি অনেক গাছ কিনেছি, ওগুলো নিয়ে ভালো করে রাখতে হবে। পরে কথা হবে। না, আর একটু বসো। তোমার সাথে আমার কথা আছে। তুমি কি জানো আমার চাকরি হয়েছে আর চাকরির জন্য ট্রেনিংয়ে আমি জাপানে যাচ্ছি? রিমা একটু মিষ্টি হেসে বলল- যাক একটা সুখবর শুনতে পেলাম। তা আমাদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছ কবে? আর হ্যাঁ, আমি ছুটিতে বাড়িতে যাচ্ছি। খুব ভালো হলো, তাহলে বাড়িতে আমাদের দেখা হচ্ছে কিন্তু। রোহান এবার জিজ্ঞেস করল- চলো না একসাথে যাই? দেখতে দেখতে কয়কটা দিন চলে গেল এবং বাড়ির দিকে রওনা হলো রিমা ও রোহান। দুজনের বাড়িই পাবনায়। শহর থেকে একটু দূরে পাশাপাশি গ্রামে বসবাস করে। গ্রামের নাম সুবর্ণপুর। বাড়ি পৌঁছানোর দুদিন পর রোহান ফোন দিল রিমাকে- রিমা, আমার মা-বাবা তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। তাই নাকি? তাঁরা আসবেন খুব ভালো কথা, তুমি আসবে না? আমি আসব এক দিন পরে। রিমা তার মা-বাবার কাছে গিয়ে বলল- মা, আমার বন্ধু রোহানের কথা তোমাকে বলেছিলাম একদিন। তার মা-বাবা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবেন। অনেক দিন ধরে বলছিল আসবে, তো বিশেষ করে তোমার হাতের বাগান দেখতে। রিমার মা-বাবা বললেন- খুব ভালো কথা আসুক, পরিচিত হওয়া যাবে। যথাসময়ে রোহানের মা-বাবা এলেন। রোহান একটু মিথ্যে বলেছিল সে আসবে না, কিন্তু সেও এসেছে। রিমা একটু গাল ফুলিয়ে ছিল। রিমার ভাবি মনি বলল- চলো তোমরা আমাদের ঘরে বসবে, গল্প করবে কেমন? আমি চা করে নিয়ে আসি। এদিকে রোহানের মা-বাবা রিমাদের বিভিন্ন ফল-ফুলের বাগান, পুকুর এগুলো দেখে তো ভীষণ খুশি। তাঁরা সবাই ড্রয়িং রুমে এসে বসলেন। বিকেলে চা খেতে খেতে কথা শুরু হলো। প্রথমে রোহানের বাবা বললেন- আপনাদের মেয়েকে আমাদের খুব ভালো লেগেছে। আমাদের ছেলেকে যদি আপনাদের ভালো লাগে, তাহলে আমরা আত্মীয়তা করতে ইচ্ছুক। একটু শুনেছিলাম যে ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে। রিমার মা বললেন- হ্যাঁ, রিমা আমাকে বলেছিল রোহানকে তার পছন্দ। আপনারা যখন আমাদের বাড়িতে এসেছেন, আপনাদের ভালো লেগেছে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। রিমার বাবা বললেন- হ্যাঁ, আমারও কোনো আপত্তি নেই। রিমার ভাবি দৌড়ে এসে হাসতে হাসতে রিমাকে বলল- হা করো রিমা, হা করো। রিমা সত্যি সত্যি হা করল। ভাবি বড় একটা রসগোল্লা রিমার মুখে দিয়ে বলল- হয়ে গেছে। কী হয়ে গেছে? আশ্চর্য আমি তো কিছুই বুঝলাম না! তারপর ভাবি রোহানকেও মিষ্টি খাইয়ে দিল। রোহান হাসতে হাসতে বলল - ভাবি, আমি বোধহয় এবার মার খাবো, আমি পালাই। বলেই সে রিমাদের ছাদে দৌড়ে চলে গেল। রিমা পিছু পিছু দৌড়ে গিয়ে রোহানকে ডাকতে ডাকতে ছাদে চলে গেল। এরপর বলল- রোহান, তুমি কি জানো কী হয়েছে? রোহান বলল- ঢাকা থেকে পৌঁছে রাতে একসঙ্গে খেতে বসে মা-বাবা যখন জানল আমার চাকরি হয়েছে এবং খুব ভালো চাকরি, তখন মা বলল, চাকরি যখন পেয়েছিস, তাহলে এবার একটা বউ নিয়ে আয়। আমি তখন বললাম, তাই? এখন একটা বউ লাগবে? ঠিক আছে বউ ঠিক করা আছে। তোমরা গিয়ে দেখে আসো। এখনই বিয়ে? আমার পড়াশোনাই তো শেষ হলো না এখনো। না না রোহান, এটা তুমি ঠিক করোনি। না না আর দেরি নয়, তুমি পড়াশোনা করো। মা-বাবার ইচ্ছে আমরা পূরণ করি। রোহান একটু দুষ্টুমি করে বলল- কী পাত্রী মশাই, পাত্র কি পছন্দ হয়েছে? রিমা ‘হ্যাঁ’ বলে দৌড়ে নিচে নিজের ঘরে চলে এল। একসঙ্গে সবাই বসে বিয়ের দিন-তারিখও সব ঠিক করলেন। রিমার বাবা রোহানের বাবাকে উদ্দেশ করে বললেন- আমরা তো এখন বিয়ান-বিয়াই হয়ে গেলাম। রিমার বাবা বললেন- আমি একটা কথা বলি বিয়াই সাহেব, যৌতুকের কিছু থাকলে বলেন। ছি ছি বিয়াই সাহেব, কী বলছেন এসব? আমার কোনো যৌতুক লাগবে না। যৌতুকের কথা বলে লজ্জা দেবেন না। না না, লজ্জা দেয়ার কিছু নয়। খোলাখুলি কথা বলাই ভালো আমি যদি খুশি হয়ে কিছু দিই, সেটাকে আপনি যৌতুক ভেবে নেবেন না। এটাই আমার অনুরোধ। তাহলে আপনি কি আমাকে যৌতুক দিতে চাচ্ছেন? না না, যৌতুক দেয়া বা নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপর একদিন অনেক ধুমধাম করে রোহান আর রিমার বিয়ে হয়ে গেল। এবার মেয়েকে বিদায়ের পালা। স্বাভাবিকভাবেই মেয়ের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় বিদায় বেলায় খুশি ও আনন্দময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রিমার মা-বাবা। মেয়ে যেন সুখী হয় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে, তাঁদের যেন সুখী করতে পারে, এটাই মা-বাবার একমাত্র চাওয়া। বিয়ের শেষ লগ্নে এসে রোহানের বাবা দেখেন, বড় বড় কয়েকটি কার্টন একটা পিকআপে সাজিয়ে দেয়া হচ্ছে। রোহানের বাবা কাছে গিয়ে বললেন- বিয়াই সাহেব, এসব কী হচ্ছে? এত বড় বড় কার্টনে কী দিচ্ছেন? আমি আগেই বলেছি যে কোনো যৌতুক নেব না। রিমার বাবা বললেন- প্লিজ, আমার এই উপহারের জন্য আপনারা রাগ করবেন না। আপনাদের এটা রাখতেই হবে। এসব তেমন কিছু না। রোহানের বাবা নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন- না আমাকে দেখাতেই হবে সেগুলোতে কী আছে! এমনকি কোনোভাবেই রোহানের বাবা কার্টনগুলো নিয়ে যেতে রাজি হলেন না। ঠাই দাঁড়িয়ে থাকলেন। পরে সবার সামনেই রিমার মা-বাবা কার্টনগুলো খুলে দেখালেন। কার্টনের ভেতরটা দেখে বরপক্ষের সবাই অবাক না হয়ে পারলেন না।
এপ্রিলের ঝাঁ ঝাঁ রোদের দিনগুলোতে একদিন হলুদ রঙের দুপুর পেরিয়ে কমলা রঙের রোদের ভেতর প্রবেশ করার অপেক্ষায় বসে আছি বারান্দায়। বারান্দার অজস্র গাছের সাথে একাকিত্ব ভাগ করে নিয়েছি প্রতিটি বিকেল। দেখেছি শূন্য ঘরের দেয়ালগুলো ক্রমশই মলিন হতে। এখন কেমন যেন সবকিছুতেই হাঁপিয়ে উঠেছি। নিঃসঙ্গ আর অবসাদগ্রস্ত পথিকের মতো শূন্য দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছি ছাদের লালচে রঙের রেলিঙের দিকে। দেখি অনিমেষ বসে আছে। আমার হাফগ্রিল বারান্দা দিয়ে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে ছাদের এ-পাশটা। এ সময় তো ওর অফিসে থাকার কথা। ছাদে কী করছে ও! তাহলে কি আগেই চলে এসেছে! আমাকে অবাক করে দিতে ছাদে গেছে! কখন এলে? ছাদে কী করো? অনিমেষ হেসে বলে, ছাদে আসো। আমার ভেতর একটা দুঃখী শালিক পাখি ডেকে উঠে মনটাকে বিষণ্ন করে দিল আরও। আমার সাথে অনিমেষের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বহুদিন হলো। কেউ কারও মনের খোঁজ রাখি না এখন। আমার আছে নিঃসঙ্গ দিন আর দীর্ঘ একাকিত্ব। অনিমেষের ব্যস্ত জীবন। আমি যেন সামনের রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে থাকা শত বছরের পুরোনো একটা গাছ। যে শত ঝড়ে, জলে ভিজে, রোদে পুড়ে মলিন হয়ে গেছে। কী ভাবছ? এসো। - অনিমেষ আবার ডাকল। এই অনিমেষকে আমি চিনতে পারছি না। ও তো অনেক বছর হলো এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না। শুধু কটা টুকিটাকি কাজের কথা ছাড়া। হুম আসছি। আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ জেগে ওঠে। দূর থেকে জুঁই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। আমি ছাদে গেলাম। অনিমেষ বলল- দেখো আকাশটা কী সুন্দর! আমি ফিরে গেলাম পুরোনো দিনগুলোতে। যেখানে আমরা অল্পবয়সী ছিলাম। ভেসে যেতাম ভালোবাসার স্রোতে। যেখানে অনিমেষ ছিল এমন সহজ, সুন্দর। হঠাৎ করেই পৃথিবীটাকে অসহ্য সুন্দর মনে হচ্ছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে কেঁপে উঠি আমি। উপলব্ধি করি যে পৃথিবীতে ভালোবাসা বেঁচে থাকে সে পৃথিবীর অসহ্য সুন্দর। টবে রাখা ফুলগুলো সুন্দর। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সুন্দর। ভালোবাসাহীন পৃথিবী মলিন, নিস্তব্ধ। পাতাহীন গাছের মতো। শুধু ডালপালা ছড়িয়ে বেঁচে থাকা। হঠাৎ আমার মনে হতে থাকে, অনিমেষ যেন একটা বিশাল দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। দেয়ালের ওপারে বিস্তীর্ণ পথ, যা পাড়ি দিয়ে নিজের খুব কাছাকাছি চলে আসা যায় না। সেখানে সম্পর্ক আবেগকে স্পর্শ করতে পারে না। আমার ভেতর বিভ্রান্তি খেলা করল। নিজের এই অসহ্য একঘেঁয়ে জীবনটার জন্য অনিমেষকেই দায়ী মনে হলো। ভেতর থেকে কেউ উচ্চ স্বরে কিছু বলে উঠছে আমাকে। জারুল ফুলগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি আকাশ দেখি, মেঘ দেখি, উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখি। তারপর জোরে একটা ধাক্কা দিই অনিমেষকে। টাল সামলাতে না পেরে অনিমেষ নিচে পড়ে যেতে থাকে। পৃথিবীর সব একঘেয়েমির পাঠ ভুলে আমার নিজেকে হাল্কা লাগে খুব।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।