Breaking news

রেলওয়ে

সমন্বিত রেল বিপ্লব এখন সময়ের বড় দাবি
সমন্বিত রেল বিপ্লব এখন সময়ের বড় দাবি

  একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ও টেকসই আধুনিকায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ খাতে, বিশেষ করে মেগা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফোর-লেন মহাসড়ক নির্মাণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকা-কক্সবাজার সংযোগ আমাদের প্রকৌশল সক্ষমতার অনন্য স্মারক। তবে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দ্রুত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই যুগে কেবল সড়ককেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অসম্ভব। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জনঘনত্ব ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে বিচার করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের পরিবহনব্যবস্থায় যুগান্তকারী গতিশীলতা আনতে হলে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত একটি 'রেল বিপ্লব' এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।   প্রশ্ন হতে পারে, ​কেন সড়ক নয়, রেলই একমাত্র টেকসই বিকল্প? ​বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ। এখানে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল রক্ষা করা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় সড়ক সম্প্রসারণের চেয়ে রেলের উন্নয়ন অনেক বেশি যৌক্তিক ও কার্যকর।   ​ চার বা ছয় লেনের একটি মহাসড়ক নির্মাণে যে বিশাল পরিমাণ ভূমির অধিগ্রহণ করতে হয়, একটি ডাবল লাইনের রেলপথ তার এক-চতুর্থাংশেরও কম জায়গায় তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করতে সক্ষম। ফলে ভূমির অপচয় যেমন রোধ হয়, তেমনি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারও নিশ্চিত হয়। তা ছাড়া ​রেল বিপ্লবের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষাও হতে পারে। কারণ, সড়ক পরিবহনের তুলনায় রেল পরিবহন বহুগুণ বেশি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তথ্যমতে, ট্রেন প্রত্যেক যাত্রী বা প্রতি টন পণ্য পরিবহনে সাশ্রয়ী হারে শক্তি খরচ করে এবং কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সড়কপথের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব এই যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। সেই সাথে রেল ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহন সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যেখানে প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বাড়ে, সেখানে রেলপথের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা অনেক বেশি লাভজনক।   ​বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।   ​পরিসংখ্যানের আলোকে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ রেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; বাকিটা চলে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর। এর ফলে মহাসড়কে অন্তহীন যানজট, সময় অপচয় ও লজিস্টিকস খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ​যদি একটি সমন্বিত রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই পণ্য পরিবহনের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সাথে সরাসরি ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ এবং প্রস্তাবিত বে-টার্মিনাল ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাথে রেলের লিংক লাইন স্থাপন করা গেলে ব্যবসার ক্ষেত্রে অপচয় নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।   ​বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে, যা দেশের রেল অবকাঠামোর চেহারা বদলে দিতে শুরু করেছে। এই যেমন ​পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। ঢাকা থেকে ভাঙ্গা হয়ে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানীর সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। এটি মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্য সরাসরি ঢাকায় আনার পথ সুগম করেছে, যা আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ অবদান রাখছে। প্রসঙ্গত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের কথাও বলা যায়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে কেবল পর্যটন খাতেরই বিকাশ ঘটেনি, বরং সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের মৎস্য ও লবণ শিল্প পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।   এখানেই শেষ নয়, ​নগর পরিবহনে এমআরটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে, ঢাকার অভ্যন্তরে যানজট নিরসনে বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল ইতোমধ্যেই তার ম্যাজিক দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক রেলব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচানো সম্ভব। আমি মনে করি, ​'রেল বিপ্লব' বাস্তবায়নে ৫ দফা কৌশলগত করণীয় বাস্তবায়ন করলে ​বিদ্যমান অর্জনগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেল বিপ্লবে রূপ দেয়া সম্ভব। রেলকে দেশের ১ নম্বর গণপরিবহনে পরিণত করতে হলে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোতে হবে।   ​প্রথমত : শতভাগ রেললাইনকে ডাবল ট্র্যাকিং ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করতে হবে। ​বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজের গোলকধাঁধায় আটকে আছে। দেশের সব প্রধান রুটকে, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-খুলনা প্রভৃতিকে অনতিবিলম্বে ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। সিঙ্গেল লাইনের কারণে ক্রসিংয়ে যে সময় অপচয় হয়, তা দূর না করলে রেলের গতি ও শিডিউল বিপর্যয় ঠিক করা সম্ভব নয়।   ​দ্বিতীয়ত : হাই-স্পিড রেল বা বুলেট ট্রেন চালুর উদ্যোগ ​ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে প্রস্তাবিত হাই-স্পিড বা দ্রুতগতির ট্রেনের প্রকল্পটি দ্রুত আলোর মুখ দেখতে হবে। এ দুই বাণিজ্যিক নগরীর দূরত্ব যদি ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে রকেটের গতিতে এগিয়ে নেবে। ​ তৃতীয়ত : সমসাময়িক অস্থির বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। তাই রেলের বৈদ্যুতিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। ​বিশ্বের আধুনিক দেশগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করছে। মেট্রোরেলের সফলতার পর আমাদের দূরপাল্লার প্রধান রুটগুলোতেও ওভারহেড ক্যাটেনারি লাইনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এটি রেলের পরিচালন ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনবে।   চতুর্থত : আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে, ​ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের সংযোগ আরও জোরালো করতে হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে আঞ্চলিক রেল ট্রানজিট ও কার্গো পরিবহন সুবিধা পুরোপুরি চালু করতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে।   পঞ্চমত : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ​রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে।   এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন ​রেলের ভৌত কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি এর প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। টিকেট কালোবাজারি সম্পূর্ণ নির্মূল করা, স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং যাত্রী সেবার মানোন্নয়নে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে রেলের বাণিজ্যিক উইংকে দক্ষ পেশাদারদের দিয়ে স্বায়ত্তশাসিত মডেলে পরিচালনা করা যেতে পারে। ​ পরিশেষে বলতে চাই, ​সড়কপথ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো অঞ্চলের যোগাযোগকে সহজ করতে পারে, কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতির স্থায়ী ও টেকসই মেরুদণ্ড গড়ে তোলে তার উন্নত রেলব্যবস্থা। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আধুনিক যুগে চীন, জাপান ও প্রতিবেশী ভারত তাদের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে রেলওয়েকেই মূল হাতিয়ার করেছে। ​উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা পূরণে রেলের এই রূপান্তর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। তাই সড়ক-কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আগামী জাতীয় বাজেটে রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবমুখী একটি 'রেল বিপ্লব' ঘটানো গেলেই দেশের যোগাযোগব্যবস্থার টেকসই মুক্তি মিলবে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0