প্রযুক্তি যদি মানবিকতাকে বিসর্জন দেয়, তাহলে সেই প্রযুক্তির প্রয়োজন কোথায়? সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনুষ্যত্বের অবনমন মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। জাতি হিসেবে আমরা যে শৌখিনতা প্রদর্শন করছি, হয়তো সে সময় এখনো আসেনি। অতিমাত্রায় আসক্তি হলে যেকোনো ভালো তার মাধুর্যতা হারায় এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা আমাদের অতিমাত্রায় শঙ্কিত করছে। গত ২৭ মে নরসিংদী রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা আমাদের সুপ্ত বোধে সজোরে ধাক্কা মেরেছে। আমরা যে এখনো মানবিক মানুষ হতে পারিনি, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। নরসিংদী রেলস্টেশনে ঢাকাগামী আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ধাক্কায় পরপারে পাড়ি জমান সুজন নামের এক দুর্ভাগা যুবকের স্ত্রী ও পুত্রসন্তান। সুজন বলেন, “ট্রেন আসার সময় আমরা বুঝতে পারিনি। ট্রেনটি কাছে আসতেই আমি চিৎকার করে উঠি। আমার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।” সংবাদমাধ্যম ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে আমরা দেখি, কঠিন বাস্তবতার নিদারুণ স্বাক্ষী সুজন কাঁধে স্ত্রী ও কোলে সন্তানের (ছেলে) লাশ এবং অন্য হাতে মেয়ে ও শপিং ব্যাগ নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছেন। সুজনের ভাষায়, “আমার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং দেড় বছরের ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাসেম ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন দুই লাশ এবং জীবিত সন্তানকে নিয়ে আমাকে একাই রেললাইন পার হতে হয়েছে। কাঁধে ছিল স্ত্রীর এবং বুকে ছিল সন্তানের লাশ; অন্য হাতে ছিল আমার আরেক মেয়ে ও শপিং ব্যাগ। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার মতো একজন মানুষও পাইনি। সবাই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল এবং ভিডিও আর টিকটক করছিল।” প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে জানা যায়, দুর্ঘটনার পরপরই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। কিন্তু সাহায্যের জন্য তেমন কেউ এগিয়ে আসেনি। অধিকাংশই ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিল। এমনকি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো, স্টেশনে থাকা শত শত মানুষের মধ্যে এমন একজন হৃদয়বান মানুষও কি ছিল না তাকে সাহায্য করার? স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য অন্তত পাশে দাঁড়ানোর? এর চেয়ে মানুষের আর কি দুঃসময় আসে! মানবতা কি জাদুঘরে স্থান দখল করেছে? আন্তরিকতা, উপলব্ধি ক্ষমতা, মানুষের দুঃখ বোঝার মানসিকতা লোপ পেয়েছে? এমন দুঃসময়ে ভেঙেচুরে চুরমার হওয়া মানুষটিকে সাহায্য না করে মোবাইলে ভিডিও ধারণ নিঃসন্দেহে মানুষের বিকৃত মানসিকতার পরিচয়। নৈতিকতার আর কত অবনমন হলে আমাদের বোধদয় হবে? সভ্যতার উৎকর্ষে হয়তো আমরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিক হচ্ছি, কিন্তু ডিভাইস ব্যবহার বিধি সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞাত? মানুষের চক্ষুলজ্জা উঠে গেলে আর কিছু বাকি থাকে না। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুষ সমাজের উপাকারে তো আসেই না, উপরন্তু দেশের অনিষ্টের অনিবার্য কারণ হয়ে ওঠে। সামাজিক মানুষ হিসেবে নিজেকে বিনির্মাণের দীক্ষা নিতে না পারলে মানব জন্মের সার্থকতা কোথায়? বর্তমানে উঠতি প্রজন্ম ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের যে অপব্যবহার শুরু করেছে, তা জাতির জন্য অশনিসংকেত। যেকোনো উপায়ে ভাইরাল হওয়ার নোংরা বাসনা তরুণদের নিম্নমানের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ফলে আমরা দেখছি নানামুখী অবক্ষয়যুক্ত সমাজের ভঙ্গুর স্থিরচিত্র। উদাহরণস্বরূপ, বিপদে এগিয়ে না এসে তা মোবাইলে ধারণ করে ভিউয়ার্স বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের হীনম্মন্যতার জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। ডুবন্ত শিশুকে সাহায্য না করে মোবাইলে সে দৃশ্য ধারণ কোন ধরনের মানসিকতা? মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য যেন অচল প্রবাদে পরিণত হওয়ার প্রহর গুনছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত শটস ভিডিওগুলো কিন্তু আমাদের চিন্তার প্রতিফলন। কিন্তু সেখানে দৃশ্যমান ভিডিওগুলোতে প্রজ্ঞা কোথায়? সবই রগরগে দৃশের রঙিন চিত্রায়ণ। তরুণ প্রজন্মের এহেন হীন মানসিকতা ও ডিভাইস আসক্তি জাতিকে কোন পথে নিয়ে চলেছে, তা ভেবে দেখার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ, তারপর বিনোদন। তবে তা অবশ্যই সুস্থ হতে হবে। কিন্তু বিনোদনের নামে যেভাবে অশ্লীলতাকে প্রমোট করা হচ্ছে, তা চরম হতাশার এবং জাতি হিসেবে কখনোই তা প্রত্যাশার নয়। শুধু কি সুজনের কাঁধে লাশই শেষ কথা! সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে। বিবেকহীন মানুষের পদভারে কলংকিত হয়েছে জমিন। রামিশা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা আমাদের ঘুমাতে দেয় না। মানুষ কত বড় নৃশংস হলে এমন হৃদয়বিদারক কাজ ঘটাতে পারে? শিউরে ওঠে হৃদয়। নিরাপত্তাহীনতা কাঁধে বয়ে দিনযাপন এক অলিখিত নরকবাস। বর্তমান অবস্থা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে সমাজের এলিট শ্রেণিও উদাসীন ও দায়িত্বহীন হয়ে পড়েছে। নিজেদের নিয়ে ব্যস্ততা ও অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা স্বাভাবিক মানুষের বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত করেছে। তা না হলে কীভাবে মিরপুরে একজন মায়ের মৃত্যু সংবাদ সাত দিন পর চাউর হয়? একজন রত্নগর্ভা মায়ের মরদেহ সাত দিন ধরে একা ফ্ল্যাটে পড়ে থাকে? পোকামাকড়ের খাবারে পরিণত হয়? পারিবারিক বন্ধন কতটা শিথিল হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও জঘন্যতম ঘটনা ঘটে! অথচ সেই অভাগী মায়ের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাগরিক ব্যস্ততা তাদের এতটাই অন্ধ করেছে যে, বছরের বিশেষ দিনেও (ঈদ) মাকে ফোন করে খবর নেয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। মা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে মমতা আর ত্যাগে তাদের মানুষ করেছেন, শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সমাজে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। হায় রে মানুষ! চরম অকৃতজ্ঞ মানুষ! শুধু কি শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায়? মানুষ মানুষ হয় কীসে? জাগ্রত মনুষ্যত্ববোধ মানুষকে মানুষ রূপে গড়ে তোলে। পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতার মনোভাব, সামাজিক মূল্যবোধ একজন মানুষকে আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কাজেই আমাদের মানসিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে। তবেই মানবিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। নতুবা মূল্যবোধ বিসর্জিত যাচ্ছেতাই সমাজের বাসিন্দা হয়ে ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে সামনের পথচলা অব্যাহত থাকবে। আমরা গ্লানি নয়, বরং সমৃদ্ধ দেশের সুনাগরিক হিসেবে আগামীর দিন যাপন করতে চাই এই হোক দীপ্ত অঙ্গীকার।
এপ্রিলের ঝাঁ ঝাঁ রোদের দিনগুলোতে একদিন হলুদ রঙের দুপুর পেরিয়ে কমলা রঙের রোদের ভেতর প্রবেশ করার অপেক্ষায় বসে আছি বারান্দায়। বারান্দার অজস্র গাছের সাথে একাকিত্ব ভাগ করে নিয়েছি প্রতিটি বিকেল। দেখেছি শূন্য ঘরের দেয়ালগুলো ক্রমশই মলিন হতে। এখন কেমন যেন সবকিছুতেই হাঁপিয়ে উঠেছি। নিঃসঙ্গ আর অবসাদগ্রস্ত পথিকের মতো শূন্য দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছি ছাদের লালচে রঙের রেলিঙের দিকে। দেখি অনিমেষ বসে আছে। আমার হাফগ্রিল বারান্দা দিয়ে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে ছাদের এ-পাশটা। এ সময় তো ওর অফিসে থাকার কথা। ছাদে কী করছে ও! তাহলে কি আগেই চলে এসেছে! আমাকে অবাক করে দিতে ছাদে গেছে! কখন এলে? ছাদে কী করো? অনিমেষ হেসে বলে, ছাদে আসো। আমার ভেতর একটা দুঃখী শালিক পাখি ডেকে উঠে মনটাকে বিষণ্ন করে দিল আরও। আমার সাথে অনিমেষের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বহুদিন হলো। কেউ কারও মনের খোঁজ রাখি না এখন। আমার আছে নিঃসঙ্গ দিন আর দীর্ঘ একাকিত্ব। অনিমেষের ব্যস্ত জীবন। আমি যেন সামনের রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে থাকা শত বছরের পুরোনো একটা গাছ। যে শত ঝড়ে, জলে ভিজে, রোদে পুড়ে মলিন হয়ে গেছে। কী ভাবছ? এসো। - অনিমেষ আবার ডাকল। এই অনিমেষকে আমি চিনতে পারছি না। ও তো অনেক বছর হলো এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না। শুধু কটা টুকিটাকি কাজের কথা ছাড়া। হুম আসছি। আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ জেগে ওঠে। দূর থেকে জুঁই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। আমি ছাদে গেলাম। অনিমেষ বলল- দেখো আকাশটা কী সুন্দর! আমি ফিরে গেলাম পুরোনো দিনগুলোতে। যেখানে আমরা অল্পবয়সী ছিলাম। ভেসে যেতাম ভালোবাসার স্রোতে। যেখানে অনিমেষ ছিল এমন সহজ, সুন্দর। হঠাৎ করেই পৃথিবীটাকে অসহ্য সুন্দর মনে হচ্ছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে কেঁপে উঠি আমি। উপলব্ধি করি যে পৃথিবীতে ভালোবাসা বেঁচে থাকে সে পৃথিবীর অসহ্য সুন্দর। টবে রাখা ফুলগুলো সুন্দর। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সুন্দর। ভালোবাসাহীন পৃথিবী মলিন, নিস্তব্ধ। পাতাহীন গাছের মতো। শুধু ডালপালা ছড়িয়ে বেঁচে থাকা। হঠাৎ আমার মনে হতে থাকে, অনিমেষ যেন একটা বিশাল দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। দেয়ালের ওপারে বিস্তীর্ণ পথ, যা পাড়ি দিয়ে নিজের খুব কাছাকাছি চলে আসা যায় না। সেখানে সম্পর্ক আবেগকে স্পর্শ করতে পারে না। আমার ভেতর বিভ্রান্তি খেলা করল। নিজের এই অসহ্য একঘেঁয়ে জীবনটার জন্য অনিমেষকেই দায়ী মনে হলো। ভেতর থেকে কেউ উচ্চ স্বরে কিছু বলে উঠছে আমাকে। জারুল ফুলগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি আকাশ দেখি, মেঘ দেখি, উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখি। তারপর জোরে একটা ধাক্কা দিই অনিমেষকে। টাল সামলাতে না পেরে অনিমেষ নিচে পড়ে যেতে থাকে। পৃথিবীর সব একঘেয়েমির পাঠ ভুলে আমার নিজেকে হাল্কা লাগে খুব।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।