আমরা বাংলাদেশিরা যখন দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসি, তখন দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও পলে পলে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও টান অনুভব করি সব সময়। মনে হয়, দেশে থাকতে যতটা মাতৃভূমিকে উপলব্ধি করেছি, বিদেশে এসে সেটা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে, মা-বাবা ও আত্মীস্বজনকে যতটা মনে পড়ে, তার চেয়ে বেশি মনে পড়ে দেশকে। বিদেশে এসে আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা আয় করি, তার পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দিই। এতে করে আমাদের পরিবার যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, তেমনি দেশ লাভবান হয় রেমিট্যান্স পেয়ে। এই আত্মতৃপ্তিই আমাদের একমাত্র পাওয়া। প্রবাস কোনো মতেই সুখের জায়গা নয়। এখানে এসে পদে পদে আমাদের ঠকতে হয়, প্রতারিত হতে হয়, কষ্ট ভোগ করতে হয়, এরপর অনেক কিছু শিখতে হয়, যার অভিজ্ঞতা জীবনে কাজে লাগানোর আগেই অনেককে দেশে ফিরতে হয় শূন্য হাতে অথবা লাশ হয়ে। অনেকে আবার সফলতার সাথে দেশে ফেরেন; কেউ আবার স্থায়ী হন বিদেশেই। বিদেশের মাটিতে আমাদের সহযোগিতা করার মতো মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এ কারণে নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত প্রবাসীদের পক্ষে কথা বলা, এমনকি আমরা যাতে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারি, সেই বিষয়টা যাতে আমাদের দেশ, দেশের সরকার গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রবাসীদের মুখপত্র হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ প্যারিস মেইল। আমরা আশাবাদী, বিশ্বের সব প্রবাসী বাংলাদেশি প্যারিস মেইলের মাধ্যমে তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা সবার সাথে শেয়ার করার সুযোগ পাবেন। আমরা সেসব কথা বাংলাদেশ সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করব। প্যারিস মেইল শুধু একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল নয়, এটি হয়ে উঠবে প্রবাসীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর; অধিকারের কথা নির্বিঘ্নে প্রকাশ করার একটি সুদৃঢ় মাইক্রোফোন। প্রবাসীরা দূরে থাকলেও মা ও মাতৃভূমি থাকে আমাদের শয়নে, স্বপনে ও জাগরণে। আমাদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একদিন বিশ্ব অর্থনীতির প্রথম কাতারে আবস্থান করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
ফ্রান্সপ্রবাসী শ্রদ্ধেয় মো. সালাহ উদ্দিন ভাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানালেন যে, ফ্রান্স থেকে ‘প্যারিস মেইল’ নামে বাংলা ভাষায় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। উদ্বোধনী সংখ্যার জন্য আমি যেন কোনো লেখা পাঠাই। তাঁর সেই প্রস্তাব আমাকে আলোড়িত করেছে। আমার মতো অখ্যাত একজন ব্যক্তিকে লেখা পাঠানোর অনুরোধ করায় প্রকাশিতব্য নতুন পত্রিকার উদ্দেশে আমার নিজস্ব ভাবনার কয়েক লাইন সংশ্লিষ্ট পত্রিকার কর্তৃপক্ষ, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে শেয়ার করছি। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে, বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অসম্ভব প্রতিভার ছোঁয়ায় আলোর মুখ দেখে। উচ্চাভিলাসী আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে প্রথম জীবনে তিনি সাহিত্য চর্চার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে গ্ৰহণ করেন। চলে যান ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্সে। অবস্থান করতে থাকেন ভার্সাই নগরীতে। লিখে ফেলেন ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’। ইংরেজি সাহিত্যে কালজয়ী হওয়ার যে সুপ্ত বাসনা তাঁর হৃদয়মাঝে আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল, ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ প্রকাশের পর তাঁর মোহ ভঙ্গ হয়। অতঃপর বাংলা সাহিত্যে তাঁর গর্বিত পদচারণ এবং মহাকাব্য, গীতিকাব্য, নাটক, সনেট, প্রহসন অসম্ভব মাত্রায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাহিত্যে প্রচলিত মিথ ভাঙার জন্য আত্মবাদী চিরন্তন সত্যকে পাঠকের কাছে মানবীয় মূল্যবোধ দ্বারা আড়োলিত করার শক্তি, সাহস ও প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় আমরা খুঁজে পাই। ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বৈশ্বিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের ভূমিকা বহু আগে থেকেই স্বীকৃত। ইতিহাসের অনেক অজানা বিষয় সংবাদপত্রের মহতী ভূমিকার কারণে মানব সমাজ জানতে পেরেছে। এই তো কিছুদিন আগে পরাশক্তি মার্কিন সমাজের নগ্নতাবাদ চরিত্র সম্পর্কে ‘এপেস্টেইন ফাইলস’ সামনে আসার মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র হলো পরিবর্তিত সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে প্রতিনিয়ত যেসব ঘটনা ঘটে এবং আগে সংঘটিত ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য সূত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করা। যুদ্ধের ভারাক্রান্ত মানচিত্র এবং তা থেকে উদ্ভূত রক্তক্ষরণ আমাদের অস্তিত্ববাদী চেতনার আশাবাদী স্বপ্নগুলো আজ বেদনার নীল তিমিরে শয্যাশায়ী। যৌবনের ফেরারি বয়ানগুলো দাসত্ববাদী ভাবনার শিরোনাম হয়ে মানবপ্রজাতির সেমেটিক সম্ভাবনাগুলো নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ব্যর্থ গুগলের সর্বগ্ৰাসী এআই কর্পোরেশন প্রাতিষ্ঠানিক নির্লজ্জতার দানবিকতায় কেড়ে নিচ্ছে অন্তর্জগতের সমূহ সম্ভাবনা। লুপ্ত হচ্ছে শান্তিবাদী ধারণার সৃষ্টিশীল মৌলিক অভিপ্রায়। পুঁজিবাদের রক্তাক্ত ভয়াল থাবা কর্তৃত্ববাদী গোধূলির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে পৃথিবীর বঞ্চিত মানুষের হিমোগ্লোবিন। হেমলকের বিষাক্ত বিষে শুভবোধের পুষ্পিত জীবনরস আজ প্রজননশাস্ত্রের ব্যর্থ পাদটীকা। এই সভ্যতার ভূখণ্ডে মানুষ আর শুনতে পায় না আজাদির বসন্তকাব্য। অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানবজাতির সামষ্টিক ভবিষ্যৎ। বৈশ্বিক দুর্যোগের এই সন্ধিক্ষণে প্যারিস মেইল তার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে শুনে আমি অতিশয় আনন্দ অনুভব করছি। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করে এই পত্রিকা নিপীড়িত বিশ্বের মুখপত্র হিসেবে কাজ করবে, তা আমার বিশ্বাস। সমাজের অন্যায়, অসংগতি; রাষ্ট্রের ভুল ধরে কর্তৃত্ববাদী চরিত্র থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবং বৈশ্বিক অপরাধবোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আশা করি এই পত্রিকা তার ভূমিকা পালন করবে। প্যারিস মেইলের পথচলা শুভ হোক তার জন্মদিনে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।
চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে। চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল? অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়। এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক। এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।
পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।