Breaking news

আত্মা

মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা
মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা

  অশীতিপর বৃদ্ধ ধনোপার্জনে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলে সে বলবে, সে নিজের জন্য কিছুই করে না। সবই সন্তানের জন্য। আসল কথা, সে নিজেই সন্তান-সন্ততির ভেতর দিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজের ভোগলিপ্সা চরিতার্থ করবে।   সন্তান যে নিজেরই নব সংস্করণ। এই যে জীবন আমাদের নিকট এতো প্রিয় এবং অমূল্য, এটাও আমরা অকাতরে না, অতি আবেগের সাথে, অতি উল্লাসের সাথে সন্তানের মঙ্গলের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছি। বিপন্ননের মাথায় কুঠারাঘাত করে, অনাথের অন্নভরা গ্রাসকে শূন্য করে, সমাজের বুকে পাথর বসিয়ে আমি সম্পদ, অর্থ, বৈভব সংগ্রহ করছি, তা কার জন্য? যার জন্য এত করেছি, সে আমার কে?   অভিধান তাকে সন্তান নামে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু আমি জানি, এক হিসাবে সে আমার কিছুই নয়। কোন অজানা দেশে সে ছিল, কোন প্রভাতে ঝরা ফুলটির মতো ভেসে এল, আবার কখন জীর্ণ পাতাটির মতো পৃথিবীর বুকে মিলে যাবে, তার সাথে আমার সম্বন্ধ কী? মূর্খ লোকে বলে আমি তার জনক, আমি তার পিতা। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তার জীবনের ওপর আমার অধিকার নাই কেন?   মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচাই যে তার ধর্ম। সে মরণকে মরণ বলে মানতে পারে না। তাহলে যে তার বেঁচে থাকা, জীবনধারণ অসাধ্য হয়ে পড়ে। সে বলছে, আমি বাঁচব; অনন্তকাল ধরে আমি বাঁচব, আমার আত্মা অবিনশ্বর। জীবন যেমন অনন্ত মহাযাত্রায় ছুটে চলে, যুগান্তরের ভেতর দিয়ে নিজের পথ কেটে চলছে, আত্মাও তেমনই অনন্তকাল ধরে কোনো বিশ্বে বেঁচে থাকবে, লীলাভিনয় করবে, নিজের কাজের ফল ভোগ করবে।   মৃত্যু সে তো ঘাঁট মাত্র; এখানে এসে আত্মা জীবনের নিকট বিদায় গ্রহণ করে আপনার দেশে চলে যায়, আর দেহ যাত্রীহীন শকটের ন্যায় ধুলায় পড়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাস, জীবন ও আত্মা এক নয়; জীবন বা জৈবশক্তি প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, আত্মা নিত্য। মানুষ তো মৃতের দেশে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু সেখানে তার বাসস্থান কোথায়?   মানুষ স্বর্গের দেশে বিরাট অভ্রভেদী প্রাসাদ গড়ছে, প্রাসাদের ধারে উদ্যান, অদূরে সিন্ধু ধারা, তটিনী, সাহচর্যের জন্য লাখ লাখ হুর ও গেলমান। এসবের ব্যবস্থা মানুষ পূর্বেই সেখানে করে রেখেছে। যা-কিছু সুন্দর, যা-কিছু ভোগ্য, যা-কিছু ইপ্সিত বলে মনে করেছে, সে সমুদয় দিয়েই মৃত্যুর ওপারে নিজের প্রবাস ঘাঁটি গড়ে তুলছে; তারই সে নাম দিয়েছে বেহেশত বা স্বর্গ, মরণের পরও বেঁচে থাকার এই ধারণার নানা শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হয়ে কী বিরাট মায়াজগতের সৃষ্টি করেছে।   নয়ন কখনো দেখেনি সে দেশের রূপ, শ্রবণ কখনো শোনেনি সেই পুরির ছন্দ; তবু সবাই সব আশা সব কামনাকে সেই অজানা আঁধার দেশের প্রাণে নিয়ন্ত্রিত করে পৃথিবীর দারুণ বেদনার ভার বুকে নিয়ে হাসছে।   মানুষ সবাই মনে করে, ইহকালের দুঃখ বরণ করে নিলে পরকালে অন্তত সুখের অধিকার আপনি এসে ধরা দেবে। কাব্য কলায়, সাহিত্য-সংগীতে, আশা-উৎসাহে, আমোদ-উপভোগ সবখানেই সেই ভাবী আকাঙ্ক্ষিত রাজ্যের জন্য প্রবল অনুরাগ ঝংকার দিয়ে উঠছে। একই বিদ্যুৎ প্রবাহ যেমন নগরীর লাখো প্রদীপের ভেতর দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করেছে, তেমনি একই মহাপ্রেরণা সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ভেতর দিয়ে কোনো দূর লক্ষ্যের পানে ছুটে চলেছে। সেই প্রেরণা মানবের ভেতর দিয়ে আপনি বেঁচে থাকতে চায়, তাই মানুষের বাঁচতে এত সাধ।   আত্মাও চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। মরণ মানুষের দৈহিক জীবনে সমাপ্তি এনে দেয় না। কিন্তু আত্মা তার পরও বেঁচে থাকতে উৎসুক। তাই মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে মানুষের এত জল্পনা-কল্পনা। সংসারের এ মায়া-বন্ধন, এই আশা-ভরসা, এই উদ্যম-সাধনা, সবই মরণের সঙ্গে সঙ্গে দারুণ ব্যর্থতায়  মিশে যাবে। এই চিন্তা মানুষ সহ্য করতে পারে না। সোনার পুতুলি সন্তান জননীর কোল শূণ্য করে কালের নির্মোঘ আঘাতে খসে পড়ছে। সে কি কখনো আর মায়ের শূণ্য কোলে ফিরে আসবে না? আসবে! মরণের পরপারে আবার সে হাসতে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে চড়ে বসবে। তা না হলে এই বিচ্ছেদ যদি শেষ হয়, তবে জীবন যে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে!   মানুষ তো সে ধারণা সহ্য করতে পারে না। ওই যে সতি নারী তার আদরের পতিকে হারিয়ে নিশিদিন অশ্রুজলে বুক ভাসাচ্ছে। সে স্বামীর ধ্যান, স্বামীর স্মৃতি জীবনের শেষ অবলম্বন ভেবে বুকে আগলে রেখেছে, এটি কি শুধু তার ব্যর্থতার জন্য?   সত্য থেকে বিচ্যুতির ফলেই মানুষের বিড়ম্বনা এবং সমাজের অশান্তির সূত্রপাত হয়। মানুষের বিশ্বাসের বিড়ম্বনা, যা মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, জীবনকে এমন স্থানে বসিয়ে দেয়, যেখান থেকে মানুষ পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় নতুন অর্থে বুঝতে বাধ্য হয়। কবি যে পৃথিবীকে একটা নতুন চেহারায় দেখছেন, তাঁর চোখে পৃথিবীর প্রতিটি তরু-বীথিকা সুরবালাদের মনোরম আসন বলে মনে হয়। প্রতিটি পল্লবের মৃদু শিহরণ আপন মানসপটে আনন্দের হিল্লোল বয়ে দেয়। সেই পৃথিবী একজন নাস্তিকের চোখে বৃহৎ ধূলিকণার স্তূপ ভিন্ন অন্য কিছু বলে মনে হয় না।   এই যে তাজমহল জগতের অষ্টম কীর্তি বলে বিশ্ববিশ্রুত, যাকে কেউ অশ্রুসৌধ, কেউ প্রেমের সমাধি বলে আখ্যাত করেছে, সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ মেজর শ্লিমানের স্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, “হায়! আমি মরলে আমার সমাধির ওপর যদি কেউ এমন স্মৃতিসৌধ গড়ে দিত, তাহলে এই মুহূর্তে মরতে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ হতো না।। সেই তাজমহলের দিকে একবার অর্থনীতিবিদের চোখে দর্শন করো, দেখবে এটি অপব্যয় ও নির্বুদ্ধিতার একটি জীবন্ত নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে ন্যায়নিষ্ঠার ভাস্বর তার চোখে এই পৃথিবীর কোথাও নিয়মের ব্যতিক্রম চোখে পড়বে না।   পক্ষান্তরে যেকোনো সুনির্দিষ্ট পন্থাকে আপনপ্রবৃত্তিসমূহের প্রতিকূল ভাবে, সে জগৎকে সর্বদা নিয়মের কঠিন নিগড়ে নিষ্পেষিত বলে দুঃখ প্রকাশ করবে। দরিদ্রের  অন্ন জোটে না, তবু তার ক্ষুধা হয়, প্রকৃতির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেককেই অভিযোগ করতে শোনা গেছে যে নিজে চুরির কাজে অভ্যস্ত, সে অন্যের অচুরিতে আস্থা রাখতে পারে না। ঠিক আমি যেমন, তেমনই করে আমি দুনিয়াটাকে দেখি।   জীবন কী, জগৎ কী? মৃত্যুর পরে কী আছে? এসব প্রশ্ন মানুষকে সব সময় আলোড়িত করে। এ যে ভীষণ সমস্যা! জীবনে যত বিপদ আসে, সব বিপদেরই একটি সমাধান আছে, কিন্তু মরণ যে বিপদ, তার কাছে তো পরিত্রাণ নেই। এ পৃথিবী এমন করে হাসতে থাকবে, এ সংসারে কাজ-কর্ম এমন করে চলতে থাকবে, শুধু আমরা থাকব না। এ চিন্তা  বড় অসহ্য। এ বন্ধুবান্ধব এমনই আমার জন্য প্রতিবছর উৎসব করতে থাকবে, কিন্তু আমি সেখানে থাকব না।   কেউ হয়তো আফসোস করে দু-একবার বলবে, আহা, অমুক আজ নেই! কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। শিশুপুত্র-কন্যারা শরতের জোছনা ভরা আকাশের পানে চেয়ে ভাববে, বাবা ঐ চাঁদের দেশে আছে, হয়তো একদিন নেমে আসবে। বসন্তে যখন ফুলে ফুলে গন্ধের বন্যা বইবে, গ্রীষ্মে যখন পাকা ফলের ম-ম সুবাস চড়িয়ে পড়বে, তখন শিশুদের বাবার কথা মনে পড়বে, কিন্তু সে কয়দিন? অদূরে কল্লোলিনী এমনি করেই চিরদিন বইতে থাকবে। শৈশবের সংস্পর্শে, যৌবনের আলিঙ্গন কত না সে তার তরঙ্গ মাখিয়ে দিয়েছে! সে এমনই উদাস মনে নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দাম ক্রিয়া দেখতে দেখতে এভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।’   মানুষ দুনিয়ার সুখ সুখ করে উন্মত্ত। এই সুখ যে ক্ষণস্থায়ী, তা মানুষ ভুলে একবারও ভাবে না। যতক্ষণ মানুষ ইন্দ্রিয়ের অনুসরণ করে, আত্মার বাণীকে শোনার জন্য কানকে উদগ্রীব না করে, ততক্ষণ মানুষ তা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আত্মারও একটা ক্রিয়া আছে, একটা দৃষ্টি আছে। এটি পৃথিবীর ওই অধ্রুব রাশির ভেতরে সত্যের সন্ধান খুঁজে বেড়ায়। যেখানে একটু শুচিতার সৌন্দর্য বিকশিত হতে দেখে, যেখানে একটু দানের প্রতিদান দেখে, মহত্ত্বের বেদনাশ্রু দেখে, সেখানেই আত্মা আমাদের উন্মনা হয়ে ওঠে। কোথায় যেন সে এমনই দেখে এসেছে। কোথায় যেন এমনই নিঁখুত সুষমা, এমনই সৌম্য-সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহিমা দেখে এসেছে।   লতিকার শ্যামাঞ্চলে ঢাকা কুসুমের হাসি - হাসিমুখ, জলদের নিবিড় কৃষ্ণতায় ঘেরা চপলার অসংবদ্ধরূপ সাগর-তরঙ্গের শীর্ষে শীর্ষে উচ্ছ্বসিত ফেনপুঞ্জের অনির্বচনীয় সুভ্রতা, সবই যেন কোন জন্মের সুখ্যাতি তার অন্তরের ভেতর জাগিয়ে দেয়। কোন যে সত্যের দেশ, জ্যোতির দেশ, সুষমার দেশ হতে সে কক্ষচ্যুত গ্রহের ন্যায় দুনিয়াতে খসে পড়েছে। এদের বর্ণে, ছন্দে, গন্ধে যেন সেই দেশের আভাস পাওয়া যায়। সেই দেশের বারতা দিয়ে এরা আত্মাকে উদাস করে তোলে, তাই আত্মা প্রতীয়মানকে ত্যাগ করে প্রচ্ছন্নকে পেতে চায়।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0