Breaking news

অশান্তি

প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের ফাঁদে বিপন্ন বন্ধন

​আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে জীবনের বেগ, তেমনি কেড়ে নিচ্ছে জীবনের আবেগ। একই ছাদ, একই ঘর, এমনকি একই বিছানা, কিন্তু সেখানে কোনো ফিসফাস নেই, নেই সারা দিনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার চেনা গুঞ্জন। আছে কেবল চারকোণা স্ক্রিনের স্মার্টফোনের নীল আলো আর আঙুলের অবিরাম যান্ত্রিক ওঠানামা।   প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমরা যেন এক অদ্ভুত ‘একাকিত্বের মেলা’য় বাস করছি, যেখানে পাশের মানুষটি ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে, আর হাজার মাইল দূরের ভার্চ্যুয়াল অবয়বটি হয়ে উঠছে পরম আত্মীয়। মুঠোফোনে আসক্তি আজ আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর মূলে আঘাত হানছে।   মুঠোফোনে আসক্তি রাতারাতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গড়ে ওঠেনি, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। যেগুলোকে আমরা সংক্ষেপে নিম্নরূপে তুলে ধরতে পারি।    ​ডোপামিন ড্রাইভ ও তাৎক্ষণিক আনন্দ : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক, কমেন্ট বা গেমের রিওয়ার্ড মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিঃসরণ করে, যা ক্ষণিকের জন্য ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। বাস্তব জীবনের চেয়ে এই ভার্চ্যুয়াল জগৎ থেকে দ্রুত ও সহজে আনন্দ পাওয়ার তাড়না মানুষকে আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়।   ​একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি : বাস্তব জীবনে একাকিত্ব, কাজের চাপ বা বিষণ্ণতা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে অনেকেই অবচেতনভাবে স্ক্রিনকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন, যা পরবর্তী সময়ে অভ্যাসে পরিণত হয়।   ​অভিভাবকদের অসচেতনতা ও ব্যস্ততা : কর্মব্যস্ত মা-বাবা অনেক সময় সন্তানকে শান্ত রাখতে বা নিজেরা ঝামেলাযুক্ত থাকতে খুব ছোটবেলাতেই তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন।   ​বিকল্প সুস্থ বিনোদনের অভাব : অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট শিশু-কিশোরদের ঘরে বন্দী করে ফেলেছে, যার সহজ বিকল্প হয়ে উঠেছে মুঠোফোনের স্ক্রিন।   ​পারিবারিক বন্ধনে ফাটল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব : ​একসময় বাঙালি পরিবারের প্রাণ ছিল যৌথ পরিবারের গল্পগাছা আর রাতের খাবার টেবিল। সেখানে সারা দিনের ক্লান্তি ধুয়ে যেত মা-বাবা, ভাই-বোন বা জীবনসঙ্গীর হাসিমুখের আলাপে। আজ সেই টেবিল নীরব। খাবার প্লেটের পাশে সগর্বে শুয়ে থাকে স্মার্টফোন।   ​মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘ফাবিং’ (Phubbing), অর্থাৎ মুখোমুখি কথোপকথনের সময় সঙ্গীকে উপেক্ষা করে ফোনে মগ্ন থাকা। এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এর প্রভাবগুলো হচ্ছে—   ​পারস্পরিক আস্থার সংকট : স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে এটি একধরনের অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছে। একই ঘরে থেকেও একে অপরকে সময় না দেয়ায় জন্ম নিচ্ছে একাকিত্ব ও সন্দেহপ্রবণতা।   ​সহানুভূতির অভাব : মুখোমুখি কথা না বলায় আমরা মানুষের চোখের ভাষা বা আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারছি না। ফলে মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে।   আমরা শারীরিকভাবে একটু-আধটু কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে দূরে চলে যাচ্ছি। কখনো কখনো এই মানসিক দূরত্ব এতটাই প্রভাব ফেলে যে, তা শারীরিকভাবেও দম্পতির মাঝখানে দেয়াল তৈরি করে দেয়। এই দূরত্বের দীর্ঘমেয়াদি ফলস্বরূপ একদিকে যেমন গভীর মানসিক বিষণ্ণতা তৈরি হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে তা পারিবারিক বিচ্ছেদের পথকে উসকে দিচ্ছে।   ​শৈশবের অপমৃত্যু : আজকের শিশু-কিশোররা চড়ুইভাতি, গোল্লাছুট বা ফুটবল খেলার আনন্দ চেনে না। তাদের শৈশব এখন চার ইঞ্চির স্ক্রিনে বন্দী। বিকেলে খেলার মাঠগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে, আর ঘরের কোণে বসে শিশুরা খেলে ‘ফ্রি ফায়ার’ বা ‘পাবজি’। শারীরিক খেলাধুলা না করায় শিশুদের মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে স্থূলতা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো আচরণগত সমস্যা।   অন্ধকারের নতুন গলি ডিজিটাল জুয়া ও মাদকাসক্তি : মুঠোফোনে আসক্তির সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো এটি খুব সহজেই তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ ও অন্যান্য মরণনেশার দিকে ধাবিত করছে। স্ক্রিন টাইম যত বাড়ছে, তরুণদের মধ্যে একঘেয়েমি কাটাতে অবক্ষয়ের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।   ​ডিজিটাল জুয়ার ফাঁদ : তিনপাত্তি, ওয়ান-এক্স বেট বা বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র। গেমের আসক্তি থেকে শুরু হওয়া এই জুয়া একপর্যায়ে তরুণদের সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে।   ​মাদকাসক্তির সাথে সংযোগ : জুয়ায় হেরে যাওয়া বা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে থাকার ফলে সৃষ্ট মানসিক অবশতা ও হতাশা কাটাতে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তিতে। অর্থাৎ ভার্চ্যুয়াল জগতের অন্ধকার সরাসরি বাস্তব জীবনের অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে।   ​জাতীয় দৈনিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক উপাত্তে যেসব চিত্র আরও ভয়াবহ আকারে ফুটে উঠেছে, সেগুলো হচ্ছে—   ​মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় : বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’-এর একটি জরিপে (যা গত ১০ জুন ২০২৪ তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকসমূহে প্রকাশিত হয়) দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭২.৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী মাত্রাতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন মাত্রার মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে ঘুমহীনতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া ও মনোযোগহীনতার হার সবচেয়ে বেশি।   ​অনলাইন জুয়ার থাবা : দৈনিক প্রথম আলোর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনলাইন জুয়ায় জড়িত, যার সিংহভাগই কিশোর ও যুবসমাজ। প্রতিদিন শত কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে এই জুয়ার মাধ্যমে।   ​পারিবারিক কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদ : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো এবং পরে ১০ জানুয়ারি ২০২৫ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে এবং ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টির কাছাকাছি তালাকের নোটিশ জমা পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে এই আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘সঙ্গীকে সময় না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, পারিবারিক সম্পর্কে চরম উদাসীনতা এবং ভার্চ্যুয়াল জগতের মোহ থেকে তৈরি পরকীয়া আসক্তি।   ​প্রযুক্তি আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ ফিরে সম্পর্কের মায়ায় বাস্তবে প্রযুক্তিকে বর্জন করা সম্ভব নয়, তবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের হাতেই। এই নীরব মহামারি থেকে বাঁচতে পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। যেমন ঘুমানোর ঘর ও খাবার টেবিলকে সম্পূর্ণ ‘মুঠোফোন মুক্ত’ ঘোষণা করতে হবে। পরিবারে অন্তত এ দুই জায়গায় যেন কেবল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতা হয়।   সপ্তাহে অন্তত এক দিন বা দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় (যেমন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৯টা) পরিবারের সবাই মিলে মুঠোফোন বন্ধ রেখে গল্প করা, বইপড়া বা গান শোনার অভ্যাস করতে হবে।   স্থানীয় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা মাঠের প্রতি আকৃষ্ট হয়।   শেষ কথা হলো, স্মার্টফোন বা আধুনিক সামাজিক মিডিয়াকে বর্জন নয় বরং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। স্মার্টফোন যেন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি না হয়ে ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখার সময় এখনই। প্রযুক্তির আলো যেন আমাদের হৃদয়ের আন্তরিকতার আলোকে নিভিয়ে না দেয়। আসুন, স্ক্রিনের কৃত্রিম উজ্জ্বলতা সরিয়ে আমরা আবার ফিরে যাই মানুষের চোখের মায়ায়, ফিরে যাই একসাথে বসে চায়ের কাপে ঝড় তোলা সেই চিরচেনা ভালোবাসার দিনগুলোতে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0