Breaking news

বৈশ্বিক সমস্যা

পরাশক্তিগুলোর দৌরাত্ম্যে বিশ্ব কি বিপর্যয়ের পথে
পরাশক্তিগুলোর দৌরাত্ম্যে বিশ্ব কি বিপর্যয়ের পথে

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র যেন আবারও এক অস্থির সময়ের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য, সাইবার প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামরিক ব্যবহার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন - সব মিলিয়ে পৃথিবী এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শান্তি আর যুদ্ধের মধ্যবর্তী সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, নাকি মানবসভ্যতা ইতোমধ্যেই এক মহাসংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে?    এ প্রশ্নের উত্তর আবেগ নিয়ে নয়, বাস্তবতার আলোকে খুঁজতে হবে। কারণ, বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন ঘোষণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি সবকিছু স্বাভাবিক আছে এমন ধারণাও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বর্তমান বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি বড় শক্তির কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়।    বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন নয়। ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ফরাসি প্রভাব, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ, এখন যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা নৌবহরের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মহাকাশ, সাইবার অবকাঠামো ও তথ্যপ্রবাহের জগতে।   বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বললেও বাস্তবে তাদের প্রতিযোগিতার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। একটি আঞ্চলিক সংঘাতও আজ বৈশ্বিক খাদ্যবাজার, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হাজার মাইল দূরের যুদ্ধও অন্য দেশের মানুষের রান্নাঘর, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।   বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো পারমাণবিক অস্ত্র। পৃথিবীতে এমন পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যার একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহৃত হলেও মানবসভ্যতা অকল্পনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। যদিও পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক প্রতিরোধের নীতিকে যুদ্ধ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরে, তবুও ভুল হিসাব, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি কখনো পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়ে ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই শুরু হয়েছে।   অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ড্রোন, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ও সাইবার সক্ষমতা যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। আজ একটি সফল সাইবার হামলা কোনো দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা, ব্যংকিং খাত, হাসপাতাল কিংবা যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে অচল করে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের ময়দান আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রবেশ করেছে।    অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও এখন শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায়ই বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক অবস্থানও এই প্রতিযোগিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়।   তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি আজ এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে বড় আকারের যুদ্ধ পরাশক্তিদের নিজেদের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, আর্থিক ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে পূর্ণমাত্রার সংঘাত কোনো এক দেশের নয়, সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই অনেক ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোকে সংযত থাকতে বাধ্য করে।    পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট সামরিক নয়; এটি আস্থার সংকট। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস যত বাড়ছে, ততই অস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এক পক্ষ নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্য পক্ষ সেটিকে হুমকি হিসেবে দেখছে। এই নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।   আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, মহামারি, জ্বালানি রূপান্তর, পানির সংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো বহু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় এসব যৌথ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দেয়।   ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। তাদের জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির প্রতি অঙ্গীকার। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।    সবশেষে বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বকে কেবল বিপর্যয়ের পথে বা মহাসংকটে - এ দুইয়ের যেকোনো একটি শব্দে সীমাবদ্ধ করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা হলো, বিশ্ব একটি গভীর ও বহুমাত্রিক মহাসংকটের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত বা সহযোগিতার অভাব এটিকে বড় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে।   তবে সবকিছুর পরও হতাশার কারণ নেই। ইতিহাস দেখায় যে, তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ও কূটনীতি, সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনোই স্থির নয়; সংঘাতের পাশাপাশি সহযোগিতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থনীতি, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে  বড় শক্তিগুলোর সহযোগিতা এখনো বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।   পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতার জন্য একটি বাস্তব ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তবে এটি এমন নয় যে, বিশ্ব অবধারিতভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে সংলাপকে, সংঘাতের চেয়ে কূটনীতিকে এবং সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় তার ওপর। ক্ষমতার রাজনীতি যদি সহযোগিতার রাজনীতিকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যায়, তাহলে বর্তমান মহাসংকট একসময় বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। আর যদি আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব দূরদর্শিতা, সংযম ও পারস্পরিক আস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এ সংকটই ভবিষ্যতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থা গঠনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
শেষের অনুশোচনা

মোবারক হোসেন ছিলেন শহরের প্রান্তে ছোট একটি ব্যবসার মালিক। সারা জীবন হিসাবি, কিপ্টে ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে তাঁর সুনাম কখনো গড়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় তাঁর পরিবার অভাবী ছিল, কিন্তু মা-বাবা সব সময় চেষ্টা করতেন সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে। অথচ সেই মোবারক সামান্য টাকা জমাতে গিয়ে মা-বাবার ওষুধ কেনা থেকেও পিছপা হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের বিপদে কখনো একটি পয়সা দেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন কেউ ধার চেয়ে বসে এই ভয়ে। সময়ের সাথে সাথে মোবারকের ব্যবসা জমে উঠল। দোকান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি ব্যাংকে জমাতেন, ফিক্সড ডিপোজিট করতেন, আর স্বর্ণ কিনে লুকিয়ে রাখতেন পুরোনো ট্রাংকে। কেউ জানত না তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ। অথচ নিজের বাড়িটাও পুরোনো, ফাটল ধরা দেয়ালে ভরা। সেখানেই থাকতেন একাকী, রান্নার কাজ করতেন নিজেই, যেন একটা ডিমও অপচয় না হয়। বয়স যখন ষাট পেরিয়েছে, তখন হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি একটি বাগানবাড়ি বানাবেন শহরের বাইরে। শেষ বয়সে একটু খোলামেলা পরিবেশে থাকা যাবে, এই যুক্তি দেখিয়ে অনেক টাকা খরচ করলেন। বাড়িটি বানাতে গিয়ে বহু শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিলেন। মোবারক বাড়ির সব খরচ নিজ হাতে হিসাব রাখতেন। ঘরগুলো আধুনিক, দেয়ালে কাঠের কারুকাজ, বারান্দায় দোলনা — সবই পরিপাটি, নিখুঁত। কিন্তু তবুও কেউ ছিল না পাশে। তিন বছর পর ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন মোবারক। বড় গেট, ফুলে ভরা বাগান, হাঁটার পথ, বিশ্রামের ছায়া — সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। একদিন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলেন। গা কাঁপুনি, জ্বর, দুর্বলতা। স্থানীয় ডাক্তার প্রথমে পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দিন পেরোতে না পেরোতেই বোঝা গেল সমস্যাটা গুরুতর। শহরে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করালেন। ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার, তৃতীয় স্টেজ। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মোবারক প্রথমবারের মতো ভাবলেন, এই বিশাল বাড়ি, জমানো টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স — সবই কেমন অর্থহীন লাগছে! জীবন এতটাই ক্ষণস্থায়ী, অথচ তিনি সারা জীবন কাটালেন হিসেব কষে। বাবার জীবনের শেষ সময়ে একটা ইনহেলার কেনেননি, মায়ের চোখে ছানি অপারেশনের খরচ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ভাতিজার পড়াশোনার খরচ না দেয়ায় কলেজে ভর্তি হতে পারেনি ছেলেটি। আজ সেই মোবারকের পাশে কেউ নেই। এক সন্ধ্যায় হাসপাতালের জানালায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে উঠল তাঁর। ছোট একটি মেয়ে পাশের রোগীকে তার বাবাকে ফল খাওয়াচ্ছে। দৃশ্যটি তাঁকে মনে করিয়ে দিল, তাঁর একটাই দোষ, ‘ভয় আর অবিশ্বাসে ভরা এক হৃদয়’। তিনি ভালোবাসতে পারেননি, কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি, এমনকি কাছের লোকজনকেও সাহায্য করতে পারেননি। টাকা ছিল, হৃদয় ছিল না। মোবারক সেই রাতে একজন নার্সকে ডেকে বললেন, “একটা কাজ করে দেবে মা?” নার্স বলল, “বলুন কাকা।” তিনি বললেন, “এই চিঠিটা আমার এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবকে পৌঁছে দেবে। আর যদি আমি বেঁচে না থাকি, আমার ঘরের আলমারির ভেতর থেকে সব কাগজ ও টাকা আমার গ্রামের দরিদ্র লোকজনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়ো।” চিঠিতে তিনি তাঁর কিপ্টামির স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন। ক্ষমা চেয়েছিলেন মা-বাবার কাছেও। আর সব সম্পত্তি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এতিমখানা, হাসপাতাল এবং গ্রামের দরিদ্রদের জন্য। দুদিন পর মোবারক হোসেন মারা গেলেন। কেউ খুব একটা কাঁদেনি, কিন্তু তাঁর চিঠি যখন প্রকাশিত হলো, তখন অনেকের চোখে পানি এসেছিল। এক কাপুরুষ, কিপ্টে মানুষ শেষ জীবনে বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের আসল সম্পদ টাকা নয়, বরং সম্পর্ক, সহানুভূতি আর উদারতা। তাঁর তৈরি বাগানবাড়িটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনাথ ও অসহায় বৃদ্ধরা বসবাস করেন। তাঁর কিপ্টে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাওয়া অনুশোচনাই হয়তো মানুষের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেল — একটা নিঃশব্দ শিক্ষা।

আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

কামিনীর গন্ধে তুমি

আকাশের নীলে কীবা কবিতার মিলে না গোলাপের সুরভিতে ডানা মেলা চিলে না। গোধূলির রং এসে সন্ধ্যায় যায় মেশে কোথাও তো নেই তুমি গল্পের শুরু-শেষে।   চাদরের আদরে না না ভোরের রবিতে না শিমুল কোলে থাকা কোকিলের ছবিতে। রিমঝিম টুপটাপ বরষার ছন্দে তোমাকেই খুঁজে পাই কামিনীর গন্ধে।  

তোমাকেই প্রয়োজন

অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে পৃথিবীর ভাগ্যাকাশ শুরু হয়েছে একের পর এক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ; মহামারি চলছে পাল্লা দিয়ে। বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশুত্ব গিলছে মনুষ্যত্ব অ-অনুমেয়— কতটা লম্বা মৃত্যুর মিছিল?   অশান্ত, ভীষণ প্রকৃতি এখন। ধৈর্য, সহনশীলতার হয়েছে অকালমৃত্যু দানবীয় শক্তিতে জ্বলে উঠেছে আগ্নেয়গিরি। বিষাক্ত বিষ উদগিরিত হচ্ছে গলগলিয়ে লাভার তাপে অঙ্গার হলো পাখির নীড়।   এমন দুর্যোগকালীন সময়ে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। কেবল তুমিই জানো স্বার্থের বেড়া ভেঙে প্রেমের কুটির রচনার মন্ত্র। তুমিই পারো ধ্বংসস্তূপকে রূপ দিতে শৈল্পিক।   এমন ধবধবে ভূতুড়ে দিনে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, কবিতা। তোমার জাদুকরি শব্দরাই পারবে মোহের ঝকমকি সরিয়ে জাগ্রত পতাকা ওড়াতে। তোমার আগুনঝরা কথা স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরবে কালের আকাশে।  

বাবারা এমনই

পিঠে পেট ঠেকেছে, তবু আনন্দ-বেসাতির কমতি নেই রোদে পুড়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে  একটা মানুষ জীবন-যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ কষ্টের টানাপোড়েনেও বাবা যেন সাঁকো বাঁধা সেতু- জীবন-নদীর দুই তীর অপত্য স্নেহে আগলে বেঁধে রাখে। নদীর স্রোত কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ধীর লয় রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রমী বাবারা এমনই বহমান নদী।

Top week

শেষের অনুশোচনা
সাহিত্য

শেষের অনুশোচনা

জুলাই ২০, ২০২৬ 0